Logo

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে গণঅভ্যুত্থান

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:১৬
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে গণঅভ্যুত্থান
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রিকশাচালক, হকার, শ্রমিক, দিনমজুর, পরিবহনকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার খেটে খাওয়া মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে সারাদেশে বিস্তৃত হয়ে এক গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের দিনগুলোতে দেখা যায় ব্যতিক্রমী এক চিত্র। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় থাকা রিকশাচালকদের অনেকেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান। কেউ আহত আন্দোলনকারীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেন, কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে সংহতি জানিয়ে আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। এসব ঘটনার ফলে আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন আরও জোরালো হয়।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট ঢাকার দোয়েল চত্বর এলাকায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি মিছিল যাওয়ার সময় রিকশাচালক মোহাম্মদ সুজন নিজের রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে দীর্ঘ সময় স্যালুট জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি ‘স্যালুট সুজন’ নামে পরিচিতি পান। অনেকের কাছে এটি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মান, সংহতি ও সমর্থনের শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, সংগঠিতভাবেও রিকশাচালকদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারা ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও স্লোগান নিয়ে মিছিলে যোগ দেন। তাদের বক্তব্য ছিল, শিক্ষার্থীদের দাবি কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, এটি সাধারণ মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। এই অবস্থান আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে।

বিজ্ঞাপন

অসহযোগ আন্দোলনের সময়ও রাজধানীর রাজপথে শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। ৪ আগস্ট গুলিস্তান থেকে শুরু হওয়া রিকশাচালকদের একটি মিছিল পল্টন, জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া চালকেরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং পথচারী ও সাধারণ মানুষও তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

একই সময়ে সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, কৃষিবিদসহ নানা পেশার মানুষও আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের উপস্থিতি আন্দোলনকে আরও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার রূপ দেয়।

হকারদের অংশগ্রহণও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে। আন্দোলনের সময় এক হকারের আবেগঘন প্রশ্ন—‘ছাত্ররা কি আমাগো ভাই-ব্রাদার না?’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের আবেগ, সহমর্মিতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের আত্মিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে আলোচিত হয়।

বিজ্ঞাপন

তবে এই আন্দোলনে শুধু সংহতিই নয়, বড় ধরনের আত্মত্যাগও ছিল শ্রমজীবী মানুষের। আন্দোলনের সহিংস দিনগুলোতে বহু রিকশাচালক, শ্রমিক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। অনেকে সরাসরি আন্দোলনে অংশ না নিয়েও সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে প্রাণ হারান।

১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হন রিকশাচালক ইসমাইল। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের সিঁড়িতে পড়ে থাকা তার নিথর দেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

একই দিনে মালিবাগ এলাকায় নিহত হন রিকশাচালক কামাল মিয়া। পরিবারের দাবি, ছেলের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি গুলির শিকার হন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

এর আগের দিন, ১৮ জুলাই নরসিংদীর মাধবদীতে আন্দোলনের সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন রিকশাচালক আইনুদ্দিন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া রাজধানীর পল্টন ও শান্তিনগর এলাকাতেও সংঘর্ষের সময় আরও এক রিকশাচালকের নিহত হওয়ার তথ্য সামনে আসে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের বড় একটি অংশ ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ। সরকারি গেজেটভুক্ত শহীদদের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শহীদদের প্রায় ৩৫ শতাংশই শ্রমজীবী শ্রেণির ছিলেন।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যেও উঠে এসেছে, শিক্ষার্থীদের পর সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির শিকার হয়েছেন শ্রমিকরা। পাশাপাশি হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভ্যানচালক, নির্মাণশ্রমিক, পোশাকশ্রমিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও শ্রম অধিকারকর্মীদের দাবি, জুলাই আন্দোলনে তিন শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর প্রাথমিক তথ্যেও বিভিন্ন খাতের নিহত শ্রমজীবী মানুষের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল।

এদিকে আন্দোলনের দুই বছর পূর্তিতে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ‘স্যালুট সুজন’ নামে পরিচিত রিকশাচালক মোহাম্মদ সুজন বলেন, আন্দোলনটি কোনো রাজনৈতিক দলের ছিল না; এটি ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। মানুষের প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সুন্দর একটি বাংলাদেশ গড়া।

তবে তার মতে, আন্দোলনের পরও মানুষের প্রত্যাশার পুরো বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো সাধারণ মানুষ নানা সংকটের মুখোমুখি। তিনি মনে করেন, নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশের প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।

বিজ্ঞাপন

সুজন আরও বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই ছিল আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD