Logo

জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সহায়তায় ব্যয় হাজার কোটি টাকা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:০৬
জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সহায়তায় ব্যয় হাজার কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহত জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে গত দুই বছরে সরকার মোট প্রায় এক হাজার ছয় কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এই অর্থের মধ্যে এককালীন অনুদান, মাসিক ভাতা, বিদেশে চিকিৎসা এবং বিভিন্ন পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে প্রায় তিন হাজার জুলাইযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে এবং নতুন পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তুতিও চলছে।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন আইন, ২০২৬’ এবং ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। এসব আইনি কাঠামোর আওতায় আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরবর্তীতে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। আন্দোলনের সময় নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে যাচাই-বাছাই শেষে সরকারি তালিকায় ৮৪৩ জন জুলাই শহীদের নাম রয়েছে। এ পর্যন্ত ১৩ জনের শহীদ গেজেট বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে তিনটি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত ১৪ হাজার ৩৬৮ জন জুলাইযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। মিথ্যা তথ্য বা একাধিকবার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগে ২২১ জনের গেজেটও বাতিল করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। পারিবারিক পরিস্থিতি অনুযায়ী কেউ ১০ লাখ, কেউ ২০ লাখ এবং কেউ ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত ৮০৪টি শহীদ পরিবারকে সঞ্চয়পত্র এবং ৭৯০টি পরিবারকে নিয়মিত মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে।

আহত জুলাইযোদ্ধাদেরও তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ‘ক’ শ্রেণির অতি গুরুতর আহতরা এককালীন ৫ লাখ টাকা এবং মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। ‘খ’ শ্রেণির গুরুতর আহতদের এককালীন ৩ লাখ টাকা ও মাসে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। আর ‘গ’ শ্রেণির আহতরা এককালীন এক লাখ টাকা এবং মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যয়ও বহন করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (বাজেট, হিসাব ও অডিট এবং অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান শাখা) মোহাম্মদ ফারুক হোসেন জানান, এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ৪৩৬ জন জুলাইযোদ্ধা এককালীন অনুদান, মাসিক ভাতা অথবা উভয় ধরনের আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহীদ পরিবারের সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি ১১ লাখ টাকা। আহত জুলাইযোদ্ধাদের এককালীন সহায়তায় ব্যয় হয়েছে ২১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা, আর মাসিক ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৬৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

এছাড়া গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫৪ জনকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যেখানে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩৬৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তায় মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬ কোটি টাকা।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শহীদ পরিবারের ভাতা ও সঞ্চয়পত্র বাবা-মা, স্ত্রী এবং সন্তানের মধ্যে নীতিমালা অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক জটিলতার কারণে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মধ্যে মাসিক ভাতা ভাগ করে দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২০ হাজার টাকার ভাতা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে আলাদা হিসাবে পাঠানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ ধরনের প্রায় ৮০ শতাংশ জটিলতা ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে এবং বাকি সমস্যাগুলোও পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তির কাজ চলছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের সহায়তায় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট যাত্রা শুরু করা এই ফাউন্ডেশন প্রাথমিকভাবে শহীদ পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা এবং আহতদের ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেয়। যদিও পরবর্তীতে আর্থিক সংকটের কারণে সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আবাসনের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় শহীদ পরিবারের জন্য জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের জমিতে ‘৩৬ জুলাই আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যাতে স্থায়ী আবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা যায়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৫৩ জন নতুন জুলাইযোদ্ধার নাম গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকশ আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাচাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের নাম পর্যায়ক্রমে গেজেটভুক্ত করা হবে।

বিজ্ঞাপন

সরকার এখন আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্রায় তিন হাজার জুলাইযোদ্ধাকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। আগ্রহীদের আবেদন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরও নতুন একটি পুনর্বাসন প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করছে। প্রকল্পের আওতায় শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে আর্থিক সহায়তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকাভিত্তিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে এবং অনুমোদনের পর ব্যয়, কার্যক্রম ও বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD