তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্টি ৬৬.৩ শতাংশ, সরকারে ৫৪.৫

সরকার পরিচালনার প্রথম ১৮০ দিন পূর্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত জাতীয় জনমত জরিপে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের প্রতি তুলনামূলক উচ্চ সন্তুষ্টির চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশে।
বিজ্ঞাপন
দেশ বর্তমানে সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না—এ প্রশ্নেও উত্তরদাতাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেছে। জরিপে ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। বিপরীতে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশের ধারণা, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা কোনো মতামত দেননি।
বুধবার (১৯ আগস্ট) আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ ভবনে ‘জনমত জরিপ: বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ডপলার রিসার্চ বাংলাদেশ লিমিটেড তাদের প্রথম ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’-এর ফল প্রকাশ করে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থায় এগিয়ে অধিকাংশ শ্রেণি
বিজ্ঞাপন
জরিপের ফল অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট। বিপরীতে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ অসন্তুষ্ট এবং ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মন্তব্য করেননি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আয়ের মতো বিভিন্ন শ্রেণিবিন্যাসেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬০ শতাংশের ওপরে রয়েছে বলে জরিপে দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সমর্থনের ক্ষেত্রেও কাছাকাছি চিত্র দেখা গেছে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার তুলনায় পুরো সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে সন্তুষ্টি কম। সরকারের সামগ্রিক কাজে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা।
দেশ সঠিক পথে কি না, মতভেদ স্পষ্ট
দেশের গতিপথ নিয়ে জনমতে বিভাজনও জরিপে স্পষ্ট হয়েছে। ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। অন্যদিকে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দলীয় সমর্থনের ভিত্তিতে এ মতামতে পার্থক্য রয়েছে। বিএনপির সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ দেশকে সঠিক পথে রয়েছে বলে মনে করেন। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে একই মত পোষণ করেন ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিভাগীয় পর্যায়েও ভিন্নতা দেখা গেছে। ময়মনসিংহে ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা দেশের গতিপথকে সঠিক মনে করলেও খুলনায় এ হার ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্য বড় উদ্বেগ
বিজ্ঞাপন
নাগরিকদের কাছে দেশের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
জরিপে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে প্রধান সমস্যা বলেছেন ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানকে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতা বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
সরকারের বিভিন্ন খাতের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ, জ্বালানি ও গ্যাস খাতে ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের দামের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে শিক্ষা খাতে সরকারের পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন ৭০ দশমিক ৬ শতাংশ।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে হতাশা
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমান অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। বিপরীতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে আগামী এক বছরে নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা এক বছর আগের তুলনায় বেশি আশাবাদী।
জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বলছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে এই আশাবাদকে সরাসরি অর্থনৈতিক উন্নতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না; এটি মূলত মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন।
ফ্যামিলি কার্ডে ব্যাপক সমর্থন
বিজ্ঞাপন
সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও কয়েকটি উদ্যোগের প্রতি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাওয়া গেছে। ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছেন ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা। নতুন করনীতির পক্ষে মত দিয়েছেন ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষেও ৭০ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন।
নিরাপত্তা নিয়ে জরিপে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, রাতে একা চলাচলের সময় তারা নিরাপদ বোধ করেন। ধর্মীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৮২ শতাংশ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা নিজেদের ধর্ম পালনে নিরাপদ মনে করার কথা জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
বিরোধী নেতাদের কর্মকাণ্ডেও ভিন্ন চিত্র
জরিপে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কর্মকাণ্ডকে ভালো হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা। এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের কর্মকাণ্ডকে ভালো বলেছেন ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
আরও পড়ুন
তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এখনো তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত নন। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ক্ষেত্রে এ হার ৩২ দশমিক ১ শতাংশ এবং এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের ক্ষেত্রে ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ।
‘সরকারের হানিমুন পিরিয়ড প্রায় শেষ’
জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, ‘জরিপ বলছে সরকারের হানিমুন পিরিয়ড প্রায় শেষ। প্রধানমন্ত্রীর উচ্চ গ্রহণযোগ্যতা সরকারের জন্য স্বস্তির খবর হলেও মন্ত্রিসভার সদস্যদের পারফরম্যান্স নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন আছে। মানুষ জীবন-জীবিকা ও সুশাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন। সরকারকে এই চ্যালেঞ্জগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ শাহান, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার তুষার এবং ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াৎ সারওয়ার উপস্থিত ছিলেন।
ডপলার রিসার্চ বাংলাদেশ লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের ৬৪ জেলার ৪৮৯টি ওয়ার্ড ও গ্রামে জরিপটি পরিচালিত হয়। কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড টেলিফোন ইন্টারভিউ (CATI) পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জরিপের মার্জিন অব এরর ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কোনো রাজনৈতিক দল বা মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ছাড়াই স্বাধীনভাবে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে।








