তারেক রহমানের ভারত সফরে দিল্লির আগ্রহের নেপথ্যে কী?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চললেও এখনো সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে তারেক রহমানকে দ্রুত দিল্লি সফরে নেওয়ার আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এরই মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুই দফায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রথমবার ছিল দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য। পরে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানানো হয়।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতে ব্রিকস সম্মেলন হওয়ার কথা থাকায় সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর আগে ২১ আগস্টকে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের তারিখ হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
ঢাকার ‘অনুকূল পরিবেশ’ চাওয়ার বিষয়টি
বিজ্ঞাপন
ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের আলোচনায় তারেক রহমানের সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ১০ আগস্ট ঢাকায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবার বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ওই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বানও জানানো হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের কর্মকর্তারা তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে সফরের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি বিষয়কে সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সফরের সঙ্গে এমন কোনো নির্দিষ্ট শর্তের কথা বলা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সফর নিয়ে দিল্লির তৎপরতা
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর তৎপরতাও আলোচনায় এসেছে। ১০ আগস্ট তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরদিন তিনি দিল্লি যান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এরপর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তার বক্তব্যে দুই দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দীনেশ ত্রিবেদীর মতে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব মুখোমুখি বসলে বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা সম্ভব। একই সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
গত ১৮ আগস্ট তিনি জানান, নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে ভারত সফরে গেলে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য ভারত সরকার অপেক্ষা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দিল্লির আমন্ত্রণ এখনো বহাল
বিজ্ঞাপন
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত তারেক রহমানকে দেওয়া আমন্ত্রণ প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ১৪ আগস্টের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে সাংবাদিকেরা সফরের সম্ভাব্য সময়, ব্রিকস সম্মেলনের আগে বা পরে সফর এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে সফরের কোনো শর্ত যুক্ত আছে কি না—এসব বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও আমন্ত্রণ রয়েছে। এ বিষয়ে অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
ফলে ভারতের প্রকাশ্য অবস্থান থেকে আপাতত যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো—আমন্ত্রণ বহাল রেখে আলোচনার সুযোগ ধরে রাখতে চায় নয়াদিল্লি।
বিজ্ঞাপন
সাবেক কূটনীতিকদের ভিন্নমত
তবে ভারতের সাবেক কয়েকজন কূটনীতিক এ বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টির সঙ্গে তারেক রহমানের ভারত সফরকে যুক্ত করার সমালোচনা করেছেন। তার মতে, প্রত্যর্পণ একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং সেটিকে দ্বিপক্ষীয় সফরের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব কানওয়াল সিবালও সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ যুক্ত করার সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি সতর্ক করে বলেছেন, তারেক রহমান ভারত সফর না করলে দুই দেশের যোগাযোগ দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সাবেক কূটনীতিকদের ব্যক্তিগত মতামত; এগুলো ভারতের সরকারি অবস্থান হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
কেন তারেক রহমানকে দিল্লিতে চাইছে ভারত?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পুরোনো সমীকরণ বদলে গেছে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ চাইছে। একই সময়ে ঢাকার সঙ্গে চীনসহ অন্যান্য দেশের সম্পর্কও আরও সক্রিয় হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখী অংশীদারত্বের বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত বাস্তবতার কারণে ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আস্থার সংকটের কেন্দ্রে শেখ হাসিনা
বিজ্ঞাপন
দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি শেখ হাসিনার অবস্থান। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তার প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল বক্তব্যকে কেন্দ্র করেও দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। ভারতীয় পক্ষ জানিয়েছিল, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং ভারত সরকার এর সঙ্গে জড়িত নয়। তবে বাংলাদেশের কাছে বিষয়টি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
এ অবস্থায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে না। দুই দেশের সম্পর্ক নতুন ভিত্তিতে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সামনে এখন মূল প্রশ্ন
ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দ্রুত সফরে নেওয়ার আগ্রহের কয়েকটি কারণ ইতোমধ্যে স্পষ্ট। মোদীর দুই দফা আমন্ত্রণ, ভারতীয় হাইকমিশনারের তৎপরতা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণ বহাল রাখার বক্তব্য—সব মিলিয়ে দিল্লির আগ্রহ অস্বীকার করার সুযোগ কম।
অন্যদিকে ঢাকা চাইছে, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হোক। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দুই দেশের পুরোনো বিরোধগুলোও তাই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকছে।
ফলে এখন প্রশ্ন শুধু বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন কি না—তা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ঢাকা ও দিল্লি এই সফরকে অতীতের বিরোধ মেটানোর সুযোগ হিসেবে নেবে, নাকি নতুন সম্পর্কের ভিত্তি তৈরির সূচনা করবে।








