Logo

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫৩
স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল | ফাইল ছবি

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো মা যেন সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর জন্য চোখের পানি না ফেলেন। গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যতই ক্ষমতাবান হোক, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

রবিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ৩০ আগস্ট এমন একটি দিন, যা গুমের শিকার মানুষ ও তাদের পরিবারের দীর্ঘ বেদনা ও অপেক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘স্মরণ করছি, সেই সব মা-বাবা, ভাই-বোনদের যারা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন-এই বুঝি তাদের সন্তান, স্বজন ফিরে এলো। স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে, যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি, সেই সন্তানকে, যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়। কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে আর ফিরে আসেননি।’

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গুমের নির্মম শিকার সব ব্যক্তি, পরিবার, স্বজন ও সহযোদ্ধার প্রতি জানাই আমার গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা। গুম-নির্যাতনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আমি তাদের আত্মার চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করি।’

বিজ্ঞাপন

গুমকে কোনো সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক অস্তিত্ব। এ এক জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।’

তিনি বলেন, সংবিধান নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার একই সঙ্গে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

গত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখনই আন্দোলন করেছেন, তখনই তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে হত্যা করা হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। রাষ্ট্রপতির ভাষ্য, ‘অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঘৃণ্য অপরাধকে সবসময় অস্বীকার করে গেছে।’

গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির নেতা এম ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং সাজেদুল ইসলাম সুমনের নাম উল্লেখ করেন তিনি। তাদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা ও বেদনার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।

এ ছাড়া আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গুম ও আটকে রাখার প্রসঙ্গও তার বক্তব্যে উঠে আসে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘মঞ্চে উপবিষ্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। এ দেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন, যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।’

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু গুম-নির্যাতনের সংস্কৃতি সেই আকাঙ্ক্ষার বিপরীত একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই সময়ে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। যিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম, খুন, অত্যাচার, নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশেই হবে।’

তিনি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের পথে এগিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জনকে নিখোঁজ ও মৃত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুম ও গোপন হত্যার অভিযোগও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তার মতে, রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তবে শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘদিন নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়েও রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে বলে জানান তিনি। চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে-কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ।’

দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বিচার করা যায় না উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং নাগরিকের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের,তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব, গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD