Logo

সালাহউদ্দিন আহমদের আসনবদল ঘিরে উপনেতা হওয়ার নতুন জল্পনা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৩৮
সালাহউদ্দিন আহমদের আসনবদল ঘিরে উপনেতা হওয়ার নতুন জল্পনা
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নতুন আসনবিন্যাসকে কেন্দ্র করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সদ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্যপদ ছাড়ার পর তার ছেড়ে যাওয়া আসনে বসানো হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদকে। এর পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কি তাকে সংসদ উপনেতার দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে?

বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে নতুন আসনবিন্যাসে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনে দেখা যায় সালাহউদ্দিন আহমদকে। এতদিন ওই আসনে বসতেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সংসদ নেতার পাশের আসনটি কোনো সাংবিধানিক পদ নির্দেশ করে না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রথম সারির আসনবিন্যাস অনেক সময় দলের ভেতরে নেতাদের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে মির্জা ফখরুলের জায়গায় সালাহউদ্দিন আহমদের বসা রাজনৈতিক মহলে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে এখন পর্যন্ত তাকে সংসদ উপনেতা করার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসেনি। জাতীয় সংসদের সরকারি ওয়েবসাইটেও ত্রয়োদশ সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর তালিকায় বর্তমানে উপনেতার নাম নেই। সেখানে সংসদ নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম রয়েছে।

উপনেতার দায়িত্ব নিয়ে যা জানা যায়

বিজ্ঞাপন

সংসদ উপনেতার পদটি প্রধানমন্ত্রীর বিকল্প নির্বাহী পদ নয়। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে বা তার কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়ার বিষয়টিও সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদে পৃথকভাবে নির্ধারিত।

সংসদের সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উপনেতার মূল দায়িত্ব সংসদ নেতা ও সংসদীয় কার্যক্রমে তাকে সহায়তা করা। বিশেষ করে আইন প্রণয়ন ও সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রমে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্ব ও সমন্বয়ে এ পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাই সালাহউদ্দিন আহমদকে উপনেতা করা হলে তার ভূমিকা হবে মূলত সংসদীয় পরিসরে সংসদ নেতাকে সহায়তা করা; প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সরকারের নির্বাহী দায়িত্ব নেওয়া নয়।

বিজ্ঞাপন

কেন সালাহউদ্দিনকে নিয়ে আলোচনা?

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদ সদস্যপদ ছাড়েন। একই সঙ্গে তার ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। এর পর সংসদের প্রথম সারির আসনবিন্যাসে পরিবর্তন আসে।

আগের বিন্যাসে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পাশের আসনে ছিলেন মির্জা ফখরুল। তার পরের আসনে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং এরপরের আসনটি ছিল সালাহউদ্দিন আহমদের।

বিজ্ঞাপন

নতুন বিন্যাসে ফখরুলের জায়গায় সালাহউদ্দিন আহমদ উঠে এসেছেন। তার পরের আসনে রয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং এরপর রয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

একই সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রথম সারিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য আমানউল্লাহ আমানকেও সামনে আনা হয়েছে। ফলে আসনবিন্যাসের এই পরিবর্তনকে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকেও দেখছেন অনেকে।

দলের ভেতরে নানা হিসাব

বিজ্ঞাপন

বিএনপির মধ্যম সারির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মির্জা ফখরুলের ছেড়ে যাওয়া আসনে কে বসবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা ছিল। জ্যেষ্ঠ নেতাদের কয়েকজনের নামও সম্ভাব্য হিসেবে আলোচনায় এসেছিল। শেষ পর্যন্ত সালাহউদ্দিন আহমদকে সেখানে বসানোয় নতুন করে রাজনৈতিক হিসাব শুরু হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ মনে করছে, চিফ হুইপকে দেওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতেই নতুন আসনবিন্যাস হয়েছে। অন্য একটি অংশের ধারণা, সংসদীয় কার্যক্রমে সংসদ নেতাকে সহায়তা করার জন্য সালাহউদ্দিন আহমদকে সামনে আনা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ভিন্ন ব্যাখ্যা

বিজ্ঞাপন

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার ছেড়ে যাওয়া জায়গায় নতুন আসনবিন্যাস হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে উপনেতার বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তার মতে, সংসদ উপনেতা হলে দলীয় কার্যক্রম সমন্বয়, সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক মোকাবিলা এবং আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। এ দায়িত্বের জন্য অভিজ্ঞ একজন নেতার প্রয়োজন।

তিনি সালাহউদ্দিন আহমদকে সম্ভাব্য উপনেতা হিসেবে দেখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দলের মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় আনেন।

বিজ্ঞাপন

সিদ্ধান্তের এখতিয়ার কার?

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। সংসদ উপনেতা কে হবেন, সেটি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার এখতিয়ার।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, এখানে সংসদ নেতার অভিপ্রায় অনুযায়ী আসন বিন্যাস হয়েছে। এটিই নিয়ম।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ বর্তমান আসনবিন্যাসকে উপনেতা নিয়োগের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিএনপির অতীতেও পদটি সবসময় পূরণ হয়নি

সংসদ উপনেতা পদ নিয়ে বিএনপির অতীতেও ভিন্ন নজির রয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদ উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে পদটি শূন্য হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকারের মেয়াদে সেখানে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

তাই এবার বিএনপি সরকার সংসদ উপনেতার পদটি পূরণ করবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সালাহউদ্দিনের অবস্থানও বাড়াচ্ছে জল্পনা

সালাহউদ্দিন আহমদ বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় তার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাকে দলের মহাসচিবের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে—এমন আলোচনা রাজনৈতিক মহলে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঠিক পাশের আসনে তাকে বসানোয় জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। তবে কেবল আসনবিন্যাসের ভিত্তিতে উপনেতা হওয়ার সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া যাবে না।

শেষ পর্যন্ত কী হবে?

এই মুহূর্তে সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ উপনেতা হচ্ছেন—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। তবে মির্জা ফখরুলের জায়গায় তাকে বসানো এবং সংসদে তার দৃশ্যমান অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছে।

শেষ পর্যন্ত তাকে উপনেতা করা হলে সংসদে বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামোয় তা হবে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। আর অন্য কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলে বর্তমান আসনবিন্যাসকে মূলত সংসদীয় ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই ব্যাখ্যা করতে হবে।

সুতরাং আপাতত সালাহউদ্দিন আহমদের নতুন আসনটি একটি রাজনৈতিক ইঙ্গিত তৈরি করলেও উপনেতা হওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই বলে দেবে, এই আসনবদলের পেছনে কেবল সংসদীয় পুনর্বিন্যাস ছিল, নাকি আরও বড় কোনো দায়িত্বের প্রস্তুতি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD