জ্বালানি সংকট আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতি ও দুর্নীতির ফসল

দেশে চলমান জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতি, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেন, দলীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আগের সরকার বিদেশিনির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছিল এবং দেশীয় জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৬৮ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বিরোধী দলের বিভিন্ন প্রস্তাবের জবাব দিতে গিয়ে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গালফ ওয়ারের মতো সংকট দেখা দেয়। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়। তবে দেশের কৃষকদের কথা বিবেচনায় নিয়ে বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম এক পয়সাও বাড়ানো হয়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সময়ে সীমান্তে জ্বালানি তেল পাচার বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
এলএনজি ঘাটতি মেটাতে নতুন পরিকল্পনা
দেশের এলএনজি ঘাটতি পূরণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সমুদ্রে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন করতে সময় প্রয়োজন হলেও বর্তমান সরকার দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
মাতারবাড়িতে চীন সরকারের সঙ্গে জি-টু-জি চুক্তির আওতায় তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এটি ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। একই এলাকায় ভূমিনির্ভর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এসব প্রকল্পের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে শত শত কিলোমিটার উন্নত পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি।
দেশীয় কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর
দেশীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও সংসদে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কারকাজ চলছে।
বিজ্ঞাপন
বৈশ্বিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্যেও ২০২১ সালের আগের চুক্তির আওতায় পায়রা দ্বিতীয় পর্যায়ের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহে সঞ্চালন ও গ্রিড লাইনের ঘাটতি দেখা দিলে সরকার নিজস্ব জিওবি তহবিল ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইন নির্মাণ করবে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর
বিজ্ঞাপন
জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার অংশ হিসেবে দেশের অনশোর ও অফশোর এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা হয়েছে বলে জানান সালাউদ্দিন আহমদ। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাসের নতুন কূপ অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনশোর ও অফশোর—উভয় এলাকায় কূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে ভোলায় গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগও সক্রিয় করা হয়েছে। সেখানে পাওয়া গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশে এলপিজির চাহিদা পূরণে মাতারবাড়িতে বড় আকারের এলপিজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও যাতে গ্যাস খালাস কার্যক্রম চালু রাখা যায়, সে জন্য একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাসমান সিবিএস প্রযুক্তির টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
ছয় মাসে দৃশ্যমান পরিবর্তনের লক্ষ্য
বিরোধী দলের প্রস্তাবিত সময়সীমার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর আর্থিক ও জ্বালানি ব্যবস্থা উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়ার পর রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার যে পরিকল্পনা নিয়েছেন, তা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো নয়; কয়লা, বায়ু, সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের সমন্বয়ে একটি টেকসই ও দুর্যোগ সহনশীল জ্বালানি খাত গড়ে তোলা।
বিজ্ঞাপন
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অনুকূল হবে এবং শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার সংকটের স্থায়ী সমাধানে কাজ করছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হবে।








