NDC 3.0 বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর তাগিদ

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর NDC 3.0 বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো এবং জলবায়ু অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দেশি-বিদেশি জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে অর্থায়নের নতুন সুযোগ কাজে লাগানো, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে সমন্বয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জাতিসংঘের জলবায়ু কাঠামো কনভেনশনের (UNFCCC) অধীনে অনুষ্ঠেয় COP31 সামনে রেখে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (BCCT), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং UNESCO Chair on Education for Sustainable Development, Green Skills and Climate Actions যৌথভাবে ‘The Road to Antalya: Climate Finance and NDC 3.0’ শীর্ষক প্রি-COP31 অনলাইন ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম।
উদ্বোধনী বক্তব্যে কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব অর্থায়নে অভিযোজন ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, বাংলাদেশ ২০০৯ সালে নিজস্ব অর্থায়নে জাতীয় জলবায়ু তহবিল গঠন করে। তবে জলবায়ু ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং NDC 3.0-এর অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে অর্থায়নের প্রয়োজনও বাড়ছে। তাই জাতীয় অর্থায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো জরুরি।
কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, “NDC 3.0-এর অগ্রাধিকারগুলোকে কীভাবে বাস্তব ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপ দেওয়া যায় এবং বাংলাদেশ কীভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহ করতে পারে—আজকের আলোচনায় আমরা সে বিষয়েই বিশেষজ্ঞদের মতামত জানতে চাই।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ ফরিদুল ইসলাম পরিবেশ দূষণ কমানো ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, শহরাঞ্চলের বায়ুদূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পাশাপাশি এসব বাস আমদানিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দিতে কর কমানো হয়েছে। কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটির ব্যবহার কমাতে খাল খনন থেকে পাওয়া মাটি ইটভাটা ও ব্লক তৈরিতে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ ও একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিনের ব্যবহার কমাতেও বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে।
বিশেষ অতিথি ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে সরকার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। জলবায়ু অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণে সরকারি অর্থের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ও দাতব্য উৎসের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগের মধ্যে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ, সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ওয়েবিনারে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের বর্তমান চিত্রও তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয়, New Collective Quantified Goal (NCQG)-এর আওতায় উন্নত দেশগুলোর নেতৃত্বে ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি, দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় ও বিকল্প উৎস মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ১.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার আহ্বান রয়েছে।
আলোচনায় উঠে আসে, জলবায়ু অর্থায়নের প্রবাহ অঞ্চলভেদে অসম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকা অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনও প্রয়োজনীয় অর্থায়নে পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। এ কারণে NDC-তে নির্ধারিত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারকে সুস্পষ্ট অর্থায়ন পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নযোগ্য ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞ প্যানেলে Green Climate Fund (GCF), বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক (MDBs), Paris Agreement-এর Article 6-এর আওতাধীন cooperative approaches এবং private capital থেকে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি এসব অর্থায়নে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলোও আলোচনায় আসে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন আকর্ষণের জন্য শুধু অর্থের প্রয়োজন তুলে ধরা যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক গ্রহণযোগ্যতা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রত্যাশিত ফলাফলও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানসম্মত প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরি এবং সরকারি, বেসরকারি ও মিশ্র অর্থায়নের সমন্বয় জরুরি।
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর ২০২৬ তুরস্কের আন্টালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য COP31 সামনে রেখে আয়োজিত এই সংলাপে জলবায়ু অর্থায়ন, NDC 3.0 বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য সমাধান বিনিময় করা হয়।
ওয়েবিনারে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের Strategic Plan 2026–2030-এর আলোকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব জোরদারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
আলোচনা ও সুপারিশগুলো NDC 3.0 বাস্তবায়ন, জলবায়ু অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমের অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়ক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে একটি Outcome Statement প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।








