Logo

পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার: ১০৭৭ কিমি রেল সংযোগের মহাপরিকল্পনা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:৫৮
পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার: ১০৭৭ কিমি রেল সংযোগের মহাপরিকল্পনা
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

দেশের উত্তর প্রান্তের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণ-পূর্বের পর্যটননগরী কক্সবাজারকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করতে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রায় ১ হাজার ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেল করিডোরকে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তর এবং নতুন রেললাইন নির্মাণে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নতুন ২০টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি ট্রেন পরিচালনার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই করিডোর চালু হলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনেও বড় পরিবর্তন আসবে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য এবং দক্ষিণাঞ্চলের সামুদ্রিক মাছ, লবণ ও শুঁটকি দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি কক্সবাজারকেন্দ্রিক পর্যটন খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা পঞ্চগড় থেকে সরাসরি ট্রেনে কক্সবাজার যেতে পারবেন। পুরো করিডোরে প্রতিদিন আড়াইশ ট্রেন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই দীর্ঘ রেলপথ চালু হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বাড়ার পাশাপাশি রেলওয়ের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

পাঁচ প্রকল্পে যুক্ত হবে উত্তর ও দক্ষিণের রেল নেটওয়ার্ক

বিজ্ঞাপন

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল সংযোগ বাস্তবায়নে পাঁচটি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো শান্তাহার-বগুড়া, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ, টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এসব প্রকল্পের মধ্যে টঙ্গী-আখাউড়া, লাকসাম-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-দোহাজারী ও শান্তাহার-বগুড়া অংশে ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজ চলছে। অন্যদিকে, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন অনেকটাই কমে আসবে।

প্রকল্পগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ অংশে ১২ হাজার কোটি টাকা, লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশে ১৫ হাজার কোটি টাকা, টঙ্গী-আখাউড়া অংশে ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং শান্তাহার-বগুড়া রেলপথ উন্নয়নে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে মিটারগেজ ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ববাজারে মিটারগেজের ইঞ্জিন, কোচ ও অন্যান্য রোলিংস্টক তৈরিও কমে যাচ্ছে। এ কারণে দেশের রেলপথকে পর্যায়ক্রমে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে দেশের পুরো রেল নেটওয়ার্ককে এই ব্যবস্থায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পাঁচটি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে রেলওয়ে। কর্মকর্তাদের ধারণা, আধুনিক ও সমন্বিত রেল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা এবং আয়—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের জন্যও রেলভ্রমণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনে বাড়বে সক্ষমতা

পঞ্চগড়-কক্সবাজার রেল করিডোরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হবে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনে সক্ষমতা বৃদ্ধি। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল আলাদা ব্যবস্থায় পরিচালিত হলেও প্রস্তাবিত উন্নয়নকাজ শেষ হলে দুই অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ আরও সহজ হবে। এর ফলে যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি মালবাহী ও কনটেইনার ট্রেনও চলাচল করতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে মালবাহী ও কনটেইনার ট্রেন চলাচল প্রায় ১০ গুণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে এবং দক্ষিণাঞ্চলের লবণ, শুঁটকি ও সামুদ্রিক মাছ উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা, ভবিষ্যতে এই করিডোর থেকে রেলের মোট আয়ের অর্ধেকের বেশি আসতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা এবং পণ্য পরিবহনের চাহিদার ওপর।

পর্যটন খাতেও এই রেল সংযোগ নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। একই রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পর্যটকেরা উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকের যাতায়াত বাড়ার পাশাপাশি পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ

পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগ গড়ে তুলতে চলতি বছরের ১৭ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে রেলওয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার পর দীর্ঘ এই করিডোর বাস্তবায়নে রেলওয়ের প্রশাসনিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘পঞ্চগড় থেকে পার্বতীপুর হয়ে সান্তাহার পর্যন্ত বর্তমানে ডুয়েলগেজ লাইন রয়েছে। মিটারগেজেও পঞ্চগড়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগ রয়েছে। তবে, আমরা একে পূর্ণাঙ্গ ব্রডগেজ সংযোগে রূপান্তর করতে চাই। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অংশের কিছু মিসিং লিংক (যেমন- টঙ্গী থেকে আখাউড়া) কাটাতে প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম অংশটি রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।’

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

তিনি আরও বলেন, ‘সান্তাহার হয়ে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রুটে ট্রেন চললে বর্তমান পথের তুলনায় প্রায় ১১৪ কিলোমিটার দূরত্ব কমে আসবে। এআইআইবির অর্থায়নে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছে; টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরির কাজ চলছে এবং আগামী জানুয়ারিতে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি সান্তাহার থেকে বগুড়ার কাহালু পর্যন্ত বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজ করা হলে পঞ্চগড় থেকে সান্তাহার-বগুড়া-সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক তৈরি হবে।’

বিজ্ঞাপন

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে রেলওয়ের মহাপরিচালক বলেন, ‘ঢাকার ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণের পর সেখান থেকে পূবাইলের দিকে যে সংযোগ লাইন হবে, তা দিয়ে ট্রেনগুলো ঢাকা স্টেশনে না এসে সরাসরি চট্টগ্রামের দিকে চলে যেতে পারবে। বর্তমানে ট্রেনগুলোকে টঙ্গীতে গিয়ে ইঞ্জিন ঘোরাতে হয়, ধীরাশ্রম-পূবাইল লাইন চালু হলে সেই প্রয়োজনও পড়বে না। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাঁচ বছর বা তার কিছু বেশি সময় লাগতে পারে, কারণ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের বিষয়টি এখানে যুক্ত। তবে, আমাদের মূল লক্ষ্য— উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত একটি সমন্বিত ও আধুনিক রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।’

রেলওয়ের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত রেল যোগাযোগ আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলো শেষ করতে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD