তুভালু ডুবছে, বিশ্ব কি জাগবে? কপ৩১-এর আগে ‘তাকু পাকাসোয়া’য় ঐক্যের ডাক

প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশির মাঝে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র তুভালু। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্ববাসীর জন্য এটি যেন ভবিষ্যতের এক জীবন্ত সতর্কবার্তা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বদলে যাচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন। যে সংকটকে একসময় ভবিষ্যতের আশঙ্কা বলা হতো, তা এখন তুভালু ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোর মানুষের বাস্তবতা।
বিজ্ঞাপন
এই বাস্তবতার মধ্যেই মঙ্গলবার তুভালু ও ফিজিতে জড়ো হন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা, মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। সামনে ২০২৬ সালের নভেম্বরে তুরস্কের আন্টালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১। তার আগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বকে দেওয়া হলো এক শক্তিশালী বার্তা—জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আর বিচ্ছিন্নভাবে নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে হবে।
এই বার্তার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তুভালুর ধারণা ‘তাকু পাকাসোয়া’—ঐক্য ও সম্মিলিত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে অর্জিত শক্তি।
তুভালুতে নেতাদের মিলন
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার ফিজি থেকে অনেক নেতা, মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যাত্রা করেন তুভালুর উদ্দেশে। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারিতে থাকা এই নিম্নভূমির প্রবালদ্বীপ রাষ্ট্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইতোমধ্যেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে।
তুভালুতে তাঁদের স্বাগত জানানো হয় বর্ণিল ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে। পরে নেতারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে অংশ নেন।
সন্ধ্যায় আবার ফিজিতে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন। সেখানে ফিজির প্রধানমন্ত্রী সিতিভেনি রাবুকা, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ, নেপাল, তুভালু, পালাউ ও মরিশাসসহ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর নেতা ও মন্ত্রীরা বক্তব্য দেন।
বিজ্ঞাপন
আলোচনায় উঠে আসে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ক্ষতি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর ঝুঁকি, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং কপ৩১-এ বাস্তবসম্মত বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা।
‘তাকু পাকাসোয়া’—ঐক্যের শক্তি
নেতারা এদিন গ্রহণ করেন ‘তাকু পাকাসোয়া নেতৃবৃন্দের ঘোষণা’। তুভালু ভাষার এই ধারণাটির মূল অর্থ—ঐক্য ও সম্মিলিত পদক্ষেপের মধ্য থেকে শক্তি অর্জন।
বিজ্ঞাপন
ঘোষণায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পৃথিবী, বিশেষ করে মহাসাগর সম্পর্কে এসব দেশের গভীর প্রজন্মান্তরের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তারা যে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, ঘোষণায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
কপ৩১-এর প্রেসিডেন্ট অব নেগোশিয়েশনস এবং অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন বলেন, ‘তাকু পাকাসোয়া’ একটি শক্তিশালী দলিল। এটি বিশ্বজুড়ে জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি শক্তিশালী পুনঃনিশ্চিতকরণ। তাঁর মতে, এই ঘোষণা আন্টালিয়ায় কপ৩১-এর জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।
‘আমাদের সবাইকে সমাধানের অংশ হতে হবে’
বিজ্ঞাপন
ফিজির প্রধানমন্ত্রী সিতিভেনি রাবুকা বলেন, জলবায়ু সংকটের সমাধানে সবাইকে অংশ নিতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তাঁর ভাষায়, ‘তাকু পাকাসোয়া’র লক্ষ্য হলো অঞ্চল ও প্রচেষ্টাকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করা।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে শুধু সমস্যার পরিমাপের জায়গা হিসেবে দেখতে চান না রাবুকা। বরং তাঁর প্রত্যাশা, এই অঞ্চল উদ্ভাবনের দ্বীপে পরিণত হবে—যেখানে জলবায়ু সংকটের সমাধান উদ্ভাবন, প্রদর্শন ও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন করা হবে।
বিজ্ঞাপন
অস্ট্রেলিয়ার বার্তা—সম্মুখসারির মানুষদের কথা শুনতে হবে
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি অস্ট্রেলিয়া দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণেই তুভালু ও ফিজির এই অনন্য প্রি-কপ আয়োজনকে তারা সমর্থন করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারিতে থাকা মানুষদের নিজেদের গল্প বলার এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পদক্ষেপের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন আলবানিজ। তিনি বলেন, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিকে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মোট জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। একই সময়ে দেশটিতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জ্বালানি ব্যবহার হয়েছে।
আলবানিজের মতে, তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দেখিয়ে দিয়েছে—চাইলেই বড় ধরনের পরিবর্তন সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
নেপালের কণ্ঠে জলবায়ু অবিচারের অভিযোগ
পৃথিবীর এক প্রান্তে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে, অন্য প্রান্তে গলছে পাহাড়ের বরফ। এই দুই সংকটকে একই সুতোয় বেঁধেছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।
তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরে প্রতি বছর জোয়ারের পানি একটু একটু করে উঁচুতে উঠছে এবং মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় আরও ভয়ংকর হচ্ছে। অন্যদিকে পাহাড়ের বরফ গলে যে পানি নামছে, সেটিও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর বক্তব্য—“পাহাড় ও মহাসাগর বিপরীত নয়; এগুলো একই পানি, একই গল্প এবং একই অভিন্ন ভবিষ্যৎ।”
খানাল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর জনগণই এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে।
নেপালের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জানান, দেশটির ৪৬ শতাংশ ভূমি বনভূমিতে আচ্ছাদিত, নতুন ভোক্তা যানবাহনের ৭০ শতাংশ বৈদ্যুতিক এবং দেশটির শতভাগ বিদ্যুৎ আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। তারপরও জলবায়ু সংকটের কারণে জনগণ জীবন ও উন্নয়নের অর্জন হারাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর ভাষায়, যে সংকট তৈরিতে জনগণের কোনো ভূমিকা ছিল না, তার মূল্য জীবন দিয়ে ও উন্নয়নের অর্জন বিসর্জন দিয়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে—এটাই জলবায়ু অবিচারের প্রকৃত সংজ্ঞা।
কপ৩১-এর প্রস্তুতি সামনে রেখে তিনি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমা রক্ষায় কোনো আপস না করার আহ্বান জানান।
তুরস্কের আহ্বান—শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য এখনই পদক্ষেপ
কপ৩১-এর মনোনীত প্রেসিডেন্ট এবং তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মুরাত কুরুম বলেন, ‘তাকু পাকাসোয়া’র চেতনায় সবাইকে নিজেদের কণ্ঠ একত্র করতে হবে।
তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে শিশুদের ভবিষ্যৎ।
তুরস্কের এই মন্ত্রী বলেন, তুভালু, ফিজি কিংবা নেপালের শিশুরা যেন আবার একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার না হয়, সে জন্য অভিন্ন ভবিষ্যতের স্বার্থে সব পক্ষকে আন্টালিয়ার পথে পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা—যে ভবিষ্যৎ ছিল আশঙ্কা, তা এখন বাস্তব
জাতিসংঘের উপমহাসচিব আমিনা মোহাম্মদ বলেন, কয়েক দশক ধরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্ক করে আসছে। এখন সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, যারা জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তাদের ওপর এই সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
তাঁর মতে, বিশ্বের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার ভিত্তি হতে হবে দায়িত্ব, সক্ষমতা ও ন্যায়বিচার।
তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে তিনি শুধু বিপন্ন বা সাহায্যের অপেক্ষায় থাকা অঞ্চল হিসেবে দেখতে নারাজ।
আমিনা মোহাম্মদের ভাষায়, “আপনারা উদ্ধারের অপেক্ষায় বসে নেই। আপনারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন।”
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংহতি কী অর্জন করতে পারে, তা বিশ্বকে দেখিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই চেতনা আন্টালিয়ায় নিয়ে গিয়ে মানুষ ও পৃথিবীর জন্য সম্মিলিত ফলাফল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সাইমন স্টিয়েলের চোখে ‘তাকু পাকাসোয়া’র গুরুত্ব
ইউএন ক্লাইমেট চেঞ্জের নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েল মনে করেন, কপ৩১-এর মাত্র এক মাস আগে ‘তাকু পাকাসোয়া’ ঘোষণা একটি শক্তিশালী সংকেত দিয়েছে।
তিনি বলেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, ক্ষয়ক্ষতির মূল্য বাড়ছে; তবে সমাধানও রয়েছে। বিভক্ত বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হলো সহযোগিতা।
তুভালু, ফিজি এবং বিশ্বের ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতাকে তিনি কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে চান না। তাঁর মতে, এগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতির এখনকার বাস্তব মানবিক চিত্র।
আন্টালিয়ার পথে ‘তাকু পাকাসোয়া’ তাই তাঁর কাছে ঐক্য ও বাস্তব পদক্ষেপের জোরালো আহ্বান—যেখানে কোনো দেশ পিছিয়ে থাকবে না।
কপ৩১-এর মাধ্যমে আরও বেশি প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরের ওপর জোর দেন স্টিয়েল। তাঁর মতে, মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে, মহাসাগরকে রক্ষা করতে হবে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখতে হবে—মানুষ, সমৃদ্ধি ও পৃথিবীর ভবিষ্যতের স্বার্থে।
তুভালু থেকে আন্টালিয়া—একটি পরীক্ষার মঞ্চ
তুভালুর মাটি থেকে উঠে আসা ‘তাকু পাকাসোয়া’ ঘোষণাকে তাই শুধু একটি কূটনৈতিক দলিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর ভেতরে রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় অস্তিত্বের সংকটে থাকা দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা, পাহাড়ি দেশের জলবায়ু বিপর্যয়, উন্নয়নশীল বিশ্বের ন্যায়বিচারের দাবি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ফিজি ও তুভালুর এই প্রি-কপ আয়োজন কার্যত আন্টালিয়ায় কপ৩১-এর আগে একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক বার্তা দিয়েছে—জলবায়ু সংকটের দায় সবার সমান না হলেও সমাধানের দায়িত্ব থেকে কেউ মুক্ত নয়।
এখন দেখার বিষয়, তুভালুর কণ্ঠ, প্রশান্ত মহাসাগরের অভিজ্ঞতা এবং ‘তাকু পাকাসোয়া’র ঐক্যের ডাক আন্টালিয়ার কপ৩১ সম্মেলনে কতটা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়।
কারণ সমুদ্র ইতোমধ্যে উঠছে। তাপমাত্রা বাড়ছে। ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও দীর্ঘ হচ্ছে।
প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব কি এবার সতর্কবার্তা শুনে সত্যিই কাজ শুরু করবে?
মিডিয়া কার্যক্রম
প্রি-কপ৩১ সংক্রান্ত গণমাধ্যম কার্যক্রমের জন্য COP31-Pacific.com ওয়েবসাইটে তথ্য পাওয়া যাবে। সংবাদকর্মীরা ছবি ও ভিডিওসহ বিভিন্ন মিডিয়া উপকরণ ব্যবহারের জন্য হোস্ট ব্রডকাস্ট লাইব্রেরি থেকে উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবেন। লগইনের প্রয়োজন হলে COP31MediaOperations@DCCEEW.gov.au ঠিকানায় যোগাযোগ করতে হবে। এসব উপকরণ গণমাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে, তবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যাবে না।








