Logo

চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় আগুনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছয়তলা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:৫৩
চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় আগুনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছয়তলা
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভবনের ছয়তলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাততলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সামান্য। আগুন বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গুদামে থাকা মালামাল সরানো এবং আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের কাজ চলছে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে মনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য জানান।

কাজী নজমুজ্জামান বলেন, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পাওয়ার পর লালবাগ থেকে দুটি, সদর দপ্তর সিদ্দিকবাজার থেকে দুটি এবং পলাশী থেকে আরও দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়। প্রাথমিকভাবে মোট ছয়টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভবনের ছয় ও সাততলায় প্রচণ্ড ধোঁয়া ও তাপ দেখতে পান। আগুন নেভানোর সময় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ছয়তলায় থাকা গুদামগুলোর বন্ধ শাটার ও তালা। প্রতিটি গুদামে চার থেকে পাঁচটি তালা ছিল। ভেতরের ক্রসফায়ার গেটেও তালা লাগানো থাকায় সেগুলো কেটে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে গুদামগুলোতে বিপুল পরিমাণ মালামাল থাকায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে বাড়তি সময় প্রয়োজন হচ্ছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা ছিল যানজট ও ধোঁয়া

কাজী নজমুজ্জামান বলেন, আগুন নেভানোর কাজে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল চকবাজারের সরু রাস্তা ও তীব্র যানজট। অগ্নিকাণ্ডের সময় ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয়।

বিজ্ঞাপন

ভবনের ছয় ও সাততলায় ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে ফায়ারফাইটারদের কাজ করতে হয়েছে। গুদামের শাটার ও তালা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে আগুন নেভানোর কার্যক্রম চালানো হয়।

পানির সংকটও মোকাবিলা করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। আশপাশের পানির রিজার্ভগুলো শেষ হয়ে আসায় পাম্প ও রিজার্ভার পরিবর্তন করে অন্য উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে আগুন নেভানোর কাজ অব্যাহত রাখা হয়।

গুদামের মালামাল সরিয়ে চলছে নির্বাপণ কার্যক্রম

বিজ্ঞাপন

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ভবনের ভেতরে এখন আর দৃশ্যমান আগুন নেই। তবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল গুদাম থেকে সরিয়ে সেখানে পানি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে মাঝেমধ্যে ধোঁয়া বের হচ্ছে।

তিনি জানান, মনসুর খান প্লাজার ছয়তলায় ১২ থেকে ১৪টি বড় গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি গুদামে আগুন লেগেছিল। এসব গুদামে ছাতা, প্রসাধনসামগ্রী, আতরের বোতল ও আতরসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুত ছিল।

গুদামগুলো মালামালে পূর্ণ থাকায় সেগুলো সরাতে সময় লাগছে। মালামালের নিচে জমে থাকা তাপ থেকে আবার আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় প্রতিটি গুদাম পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ না করে চলে গেলে পুনরায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। তাই মালামাল সরানো, পানি দেওয়া এবং আগুনের অবশিষ্ট তাপ পরীক্ষা করার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও আগুনের কারণ এখনো নিশ্চিত নয়

অগ্নিকাণ্ডে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের মূল্য সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষই নির্ধারণ করতে পারবে। এ জন্য আরও সময় প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

আগুন লাগার কারণ সম্পর্কেও এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের কেউই আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। ভবনে বিদ্যুতের সংযোগ থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

আশপাশের মার্কেট রক্ষায় ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতা

বিজ্ঞাপন

মনসুর খান প্লাজার সঙ্গে আরও তিন থেকে চারটি মার্কেট যুক্ত রয়েছে। আগুন আশপাশের ভবন ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তা প্রতিরোধে কাজ করেছেন বলে জানান কাজী নজমুজ্জামান।

তিনি বলেন, মানুষের আশঙ্কা অনুযায়ী পুরো মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মূলত ছয়তলাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাততলায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রচেষ্টায় আশপাশের মার্কেটগুলো বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

অগ্নিনির্বাপণের সময় প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার কারণে কর্মীদের পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। একজন সদস্য ১৫ থেকে ২০ মিনিট কাজ করার পর তাঁকে সরিয়ে অন্য সদস্যকে পাঠানো হয়েছে। এভাবে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনবল নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ পরিচালিত হয়।

বিজ্ঞাপন

এ সময় মার্কেটের স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা সহযোগিতা করেছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষও পানি সরবরাহ করেছে বলে জানান তিনি।

চকবাজারে অগ্নিনিরাপত্তা বাড়ানোর তাগিদ

চকবাজারকে ঐতিহ্যবাহী পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, এলাকায় সব সময় মানুষের চলাচল থাকে। সরু রাস্তা ও যানজটের কারণে স্বাভাবিক সময়েও যানবাহন চলাচলে সমস্যা হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় এ পরিস্থিতি ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তোলে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

এ সমস্যা কমাতে রাস্তাগুলো প্রশস্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ওয়াসার মাধ্যমে সড়কে হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন।

তাঁর মতে, নির্দিষ্ট স্থানে হাইড্র্যান্ট স্থাপন করা হলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ডেলিভারি পাইপ সংযুক্ত করে পানি সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে অগ্নিকাণ্ডের সময় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।

আগুন নেভাতে শুধু পানি ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, অগ্নিকাণ্ডটি সলিড ফায়ারের শ্রেণিভুক্ত। এ ধরনের আগুন নেভানোর উপযুক্ত মাধ্যম পানি। পেট্রোল বা অন্য জ্বালানিতে আগুন লাগলে ফোম ব্যবহার করা হতো।

অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য আহত হওয়ার তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নির্ধারিত কৌশল অনুসরণ করে কমসংখ্যক সদস্যকে আহত হওয়ার ঝুঁকিতে রেখে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD