Logo

সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ চুরি করলে ৩ বছরের জেল, ক্ষতিতে ৫ বছর

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫:০৮
সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ চুরি করলে ৩ বছরের জেল, ক্ষতিতে ৫ বছর
ছবি: সংগৃহীত

দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং এ খাতের কার্যক্রম সুশৃঙ্খল করতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুতের বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ থেকে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। এর আগে রবিবার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সৌরবিদ্যুৎ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। এ কারণে সরকার সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।

যেসব স্থানে স্থাপন করা যাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভবন, সরকারি কোম্পানি, বাসাবাড়ির ছাদ, আঙিনা, ভবনসংলগ্ন পতিত জমি এবং জলাশয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। এর আওতায় থাকবে সৌরচালিত সেচপাম্প, কোল্ড স্টোরেজ, বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন, চা বাগান, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। তবে বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এ অধ্যাদেশের আওতায় পড়বে না।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে অপারেশনাল এক্সপেন্ডিচার (ওপেক্স) ও ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (ক্যাপেক্স)—দুই ধরনের মডেল রাখা হয়েছে। ওপেক্স মডেলে বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ব্যয় বহন করবেন। অন্যদিকে, ক্যাপেক্স মডেলে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প স্থাপন করে এর মালিকানা রাখতে পারবে।

সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব আয় রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ আয় বিবেচনায় ক্যাপেক্স মডেলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

নেট-মিটারিং ও চুক্তির বিধান

অধ্যাদেশে নেট-মিটারিংয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজের সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন। গ্রিডে দেওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এরপরও বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকলে সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী মূল্য পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রণোদনাও দিতে পারবে।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনার জন্য গ্রাহক, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। এতে যন্ত্রপাতির গুণগত মান, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বণ্টন, বিল পরিশোধ, মালিকানা, চুক্তির মেয়াদ ও বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়া এবং ই-বর্জ্য নিরাপদে ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও চুক্তিতে রাখতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ক্যাপেক্স মডেলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেনার আর্থিক সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে না। যোগ্য সার্ভিস প্রোভাইডারদের জেলাভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হবে এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা যাবে। গ্রাহক চাইলে ওপেক্স মডেলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পারবেন।

গঠন করা হবে জাতীয় পলিসি কাউন্সিল

সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ও নীতিগত দিকনির্দেশনার জন্য জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট সচিবেরা থাকবেন। কাউন্সিল বিনিয়োগ, নেট-মিটারিং, প্রণোদনা ও ট্যারিফ কাঠামোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসককে সভাপতি এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সহায়তা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব পালন করবে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) তাদের ওয়েবসাইটে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ ও সচলতা পর্যবেক্ষণ করবে।

অবৈধ সংযোগ ও কাজে বাধা দিলেও শাস্তি

অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিভিন্ন অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে অন্য কাউকে অবৈধ সংযোগ দিলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, সংযোগ, পরিদর্শন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা সার্ভিস প্রোভাইডারকে বাধা দিলেও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। চোরাই বলে জেনেও সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ কেনা, বিক্রি বা নিজের হেফাজতে রাখাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এসব অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা, ষড়যন্ত্র কিংবা প্ররোচনা দিয়ে অপরাধ সংঘটিত করালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত একই দণ্ড পেতে পারেন।

অপরাধগুলোর বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হবে। সংশ্লিষ্ট অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত হলে মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যাবে।

বিজ্ঞাপন

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারের লক্ষ্য

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি হ্রাস, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য অর্জনে সরকার প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বিনিয়োগ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিদ্যমান বিধিবিধানের ঘাটতি পূরণ এবং এ খাতে কার্যক্রম আরও গতিশীল করার প্রত্যাশা করছে সরকার।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD