সিসি নেওয়ার পরও চার্জশিট, এসআইকে ঘিরে তদন্ত করছে পুলিশ

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা থেকে বদলি হয়ে সিসি নেওয়ার পরও ওই থানার একটি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছেন উপপরিদর্শক (এসআই) মাহিদুল ইসলাম। বদলির কারণে থানা ছাড়ার পরদিনই অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ওসি মেজবাহ উদ্দিনের সিডিএমএস আইডি ব্যবহার করে ওই চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল এসআই মাহিদুল ইসলামকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে তেজগাঁও থানায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৮ এপ্রিল তিনি মোহাম্মদপুর থানা থেকে বদলিজনিত প্রস্থান বা সিসি নেন। কিন্তু পরদিন ১৯ এপ্রিল ওই থানার একটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কোনো তদন্ত কর্মকর্তা বদলির আদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মামলার ডকেট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে হস্তান্তর করে সিসি নেন। সিসি নেওয়ার আগ পর্যন্ত তদন্তসংক্রান্ত কাজ, চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে সিসি নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে দায়িত্বগত সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় এবং ওই মামলায় হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকার কথা নয়।
চার মাসের মধ্যে চার্জশিট
বিজ্ঞাপন
মোহাম্মদপুর থানার চলতি বছরের জানুয়ারির ৩ নম্বর মামলার নথি অনুযায়ী, গত ২ জানুয়ারি অবসরপ্রাপ্ত পাইলট সৈয়দ নাজিম মাহমুদ তিনজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। দণ্ডবিধির ৩৪২, ৩৮৫, ৩৮৬ ও ৩৪ ধারায় করা মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছিলেন এসআই মাহিদুল ইসলাম।
মামলা দায়েরের প্রায় চার মাস পর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তবে তখন মাহিদুল আর মোহাম্মদপুর থানায় কর্মরত ছিলেন না। ১৮ এপ্রিল সিসি নিয়ে থানা ছাড়ার পর ১৯ এপ্রিল তিনি অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন। অভিযোগপত্রটির নম্বর ২৫৮।
বিষয়টি তদন্তে সহকারী কমিশনার
বিজ্ঞাপন
বদলির পরও এসআই মাহিদুলের চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্তের উদ্যোগ নেয় পুলিশ। গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন।
আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যা বলছেন এসআই মাহিদুল
বিজ্ঞাপন
অভিযোগের বিষয়ে এসআই মাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি ১৮ এপ্রিল সিসি নিয়েছেন, বিষয়টি সঠিক। তবে তাঁর দাবি, নিয়ম মেনেই চার্জশিট দাখিল করেছেন।
তিনি বলেন, “আমার আইডি যদি লক হয়ে যায় তাহলে আমি চার্জশিট দিয়েছি কীভাবে। আমি রাত ১২টার আগে সিডিএমএস এন্ট্রি দিয়েছিলাম, ত্রুটির কারণে সেটি পরদিন নিয়েছে।”
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তৎকালীন ওসি মেজবাহ উদ্দিনের সিডিএমএস আইডি ব্যবহার করে চার্জশিট দাখিলের অভিযোগের বিষয়ে মাহিদুল বলেন, “আমি তার সিডিএমএস আইডি ব্যবহার করিনি, বিষয়টি সঠিক নয়।”
ওসি মেজবাহ উদ্দিন যা বললেন
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে ডিবি রমনায় কর্মরত মেজবাহ উদ্দিন বলেন, বদলির পরও মাহিদুল চার্জশিট দিতে পারেন, কারণ তাঁর বদলি একই ডিভিশনের মধ্যে হয়েছে। তাঁর দাবি, মাহিদুলের সিডিএমএস আইডি লক হয়নি।
নিজের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে চার্জশিট দাখিলের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “তিনি আমার ইউজার আইডি পাসওয়ার্ড জানবেন কীভাবে? আমার ইউজার আইডি পাসওয়ার্ড তো তার কাছে থাকার কথা নয়। আর আমি তো ওখান থেকে চলে এসেছি, এখন এটা নিয়ে এত ঘাঁটাঘাঁটি করে কী লাভ।”
মামলার বিচারেও প্রভাব পড়তে পারে
বিজ্ঞাপন
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, যে থানায় কোনো পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্ব বা পোস্টিং নেই, সেই থানার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে রিপোর্ট দাখিলের বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। কারণ তদন্ত কর্মকর্তা নির্দিষ্ট থানার কর্মকর্তা হিসেবে মামলার তদন্ত করেন এবং পরে ওই থানায় তাঁর পোস্টিং না থাকলে দায়িত্ব পালনের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা থানা থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বদলি হওয়ার পরদিন একই মামলার চার্জশিটে স্বাক্ষর করলে চার্জশিট দাখিলের দিন তাঁর সংশ্লিষ্ট থানায় দায়িত্ব বা কর্তৃত্ব ছিল কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মনজিল মোরসেদের মতে, তদন্ত কর্মকর্তার ভুল বা অসতর্কতার কারণে মামলাটি বিচার পর্যায়ে দুর্বল হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আসামিপক্ষ বিষয়টি জানতে পারলে জেরার সময় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওই দিনে রিপোর্ট দাখিলের আইনগত কর্তৃত্ব ছিল কি না, সেটি আদালতের বিবেচনায় আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
•
•
বিজ্ঞাপন
•
•
•
তিনি আরও বলেন, আদালত প্রয়োজন মনে করলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি ফেরত দিতে পারেন। দায়িত্বে না থাকা থানার মামলায় রিপোর্ট দাখিলের ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা বা অসদাচরণের বিষয়ও উঠতে পারে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পক্ষে বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান বলেন, বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে। কারও গাফিলতি ছিল কি না, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত এবং আইনগতভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত শেষ হলে সিসি নেওয়ার পর এসআই মাহিদুল ইসলাম কীভাবে চার্জশিট দাখিল করলেন, তাঁর সিডিএমএস আইডির অবস্থান কী ছিল এবং তৎকালীন ওসি মেজবাহ উদ্দিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার কথা রয়েছে।








