ভোটার নিয়ে নয়, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েই চিন্তিত জামায়াত

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বহুল আলোচিত এই নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ও প্রত্যাশা দুই-ই রয়েছে। সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে রয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের চেয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েই বেশি চিন্তিত বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনের আগের দিন বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, প্রচারণায় তারা ব্যাপক জনসাড়া পেলেও ভোটের দিন ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন কি না এবং ফলাফল সঠিকভাবে প্রকাশিত হবে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নির্বাচনী জনসভা, গণমিছিল, প্রচার-প্রচারণা ও সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নেতারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
দলটির অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা, হেনস্তা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। অন্তত ৪৬টি উপজেলায় নারী সমর্থকদের ওপর হামলা, হুমকি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরেছে তারা। এসব বিষয়ে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি বলে দাবি জামায়াতের।
বিজ্ঞাপন
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, মাঠপর্যায়ে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন এক ধরনের বক্তব্য দিলেও মাঠের প্রশাসনের আচরণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। কিছু স্থানে পুলিশের দায়িত্বশীলদের আচরণ নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি শেরপুরের একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে তাদের এক নেতাকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। ওই ঘটনায় প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিল বলে দাবি করেন তিনি। প্রশাসন আরও নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভোটের দিন প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে জনগণের আস্থা নিশ্চিত করবে।
বিজ্ঞাপন
তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে রয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা। নেতাদের উচিত কর্মীদের সংযত রাখা, যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা না ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও বিশৃঙ্খলা হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, আগাম কোনো ‘নীলনকশা’ আছে—এমন ধারণা করার সুযোগ নেই। তবে রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, দুই জোটের পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে পারে। তার পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে উত্তেজনা বাড়ছে। এক পক্ষ ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্য পক্ষ ভোট ও ফলাফল রক্ষার কথা বলছে—যা নির্বাচনী পরিবেশে চাপ তৈরি করতে পারে।
তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সংস্থার তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। মৌখিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি শারীরিক সহিংসতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা পুরোপুরি অমূলক নয়।
সব মিলিয়ে ভোটার উপস্থিতির চেয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীল আচরণই এবার জামায়াতের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের দিনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কেমন হবে—তার ওপরই নির্ভর করছে ভোটের পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়।








