প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়

বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে সেই সম্পর্ক কখনোই আত্মসমর্পণ বা দাসত্বের পর্যায়ে যেতে পারে না— জাতীয় সংসদে এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু সে সম্পর্ক কখনোই একতরফা নির্ভরশীলতার হতে পারে না। প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে, কিন্তু তা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মতো হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কখনোই এমন হওয়া উচিত নয়, যেখানে এক পক্ষ কর্তৃত্ব করবে আর অন্য পক্ষ নির্ভরশীল হয়ে থাকবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা আঞ্চলিক প্রয়োজনের কারণে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, কিন্তু তা কখনোই দেশের মর্যাদা বিসর্জনের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।
বক্তব্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি চাটুকারিতা পছন্দ করতেন না এবং সমালোচনাকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য হিসেবে দেখতেন। প্রকৃত গণতন্ত্রে ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং সম্মান করতে হয়।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আহ্বান জানিয়ে জিয়াউর রহমান শুধু আত্মরক্ষার ডাক দেননি, বরং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ ও বিতাড়িত করার জন্য জাতিকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে সময় অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিষ্ক্রিয় থাকলেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল সাহসী ও কার্যকর— এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
বর্তমান প্রজন্মের একাংশ শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছে না বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন গয়েশ্বর। তিনি বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ গঠনে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে আরও বেশি তুলে ধরা প্রয়োজন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি। নানা রাজনৈতিক চাপে তাকে নত হতে বলা হলেও তিনি মাথা নত করেননি। এই আপসহীন অবস্থানের কারণেই আজ তিনি ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে পরিচিত।
গয়েশ্বর বলেন, ১/১১-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশের রাজনীতিতে বিরাজনীতিকরণের প্রবল চাপ তৈরি হয়েছিল। তখন অনেক পরিচিত নেতা দল ছেড়ে সরে গেলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই বিএনপির মূল শক্তি হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। খালেদা জিয়া কারাবরণ করেছেন, কিন্তু দেশ ছেড়ে যাননি— এটিই তার রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রমাণ।
বিজ্ঞাপন
জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির এই নেতা বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দ্রুত নৈতিক ও সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছিল। ওই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দলের ছিল না; বরং তা ছিল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত ত্যাগ ও অংশগ্রহণের ফল।
মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং দেশভাগের ইতিহাস টেনে গয়েশ্বর বলেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ— প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের কেন্দ্রে ছিল বঞ্চনা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ইতিহাসের সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে।
বিএনপির জন্মের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের হাত ধরে দলের প্রতিষ্ঠা হতে দেখা তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গর্বের বিষয়।
ব্যক্তিগত স্বার্থে রাজনীতি করেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদের দাপট দেখে তিনি নিজের আসল সনদ ছিঁড়ে ফেলেছিলেন, কারণ তিনি যুদ্ধের বিনিময়ে ব্যক্তিগত লাভ চাননি।
বিজ্ঞাপন
বক্তব্যের শেষাংশে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, শুধু নেতাদের নাম উচ্চারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের আদর্শ ধারণ ও চর্চার মধ্য দিয়েই প্রকৃত দেশপ্রেম, গণতন্ত্রচর্চা এবং রাজনৈতিক সততার প্রমাণ দিতে হবে।








