Logo

নেতা টানার নেশায় পুরোনোদের ভুলে যাচ্ছে এনসিপি?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ মে, ২০২৬, ১৫:০২
নেতা টানার নেশায় পুরোনোদের ভুলে যাচ্ছে এনসিপি?
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশের পর অল্প সময়েই দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করা দলটি এখন কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক বিস্তারে ব্যস্ত। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কমিটি গঠন, নতুন জোট ও অ্যালায়েন্স ঘোষণা এবং ভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নেতাদের দলে ভেড়ানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে চাইছে তারা।

বিজ্ঞাপন

তবে দল সম্প্রসারণের এই তৎপরতার মাঝেই সামনে এসেছে ভিন্ন এক প্রশ্ন—দলের শুরুতে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন কিন্তু পরে মতপার্থক্য ও ক্ষোভে দল ছেড়েছেন, তাদের ফেরাতে কি আদৌ আগ্রহী এনসিপি?

দলটির ভেতর ও বাইরে এখন এ প্রশ্ন নিয়ে বাড়ছে আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নতুন নেতাদের দলে টানার ব্যাপারে এনসিপি যতটা সক্রিয়, পুরোনো ও ত্যাগী কর্মীদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ততটা আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। এতে দলটির আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

পুরোনো নেতাদের ক্ষোভ

বিজ্ঞাপন

এনসিপির সাবেক যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন জানিয়েছেন, দল ছাড়ার পর থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরে আসার কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। যদিও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে অনেকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে যোগাযোগ করেছেন।

তার অভিযোগ, এনসিপি শুরুতে “নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা” গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে দলটি এখন প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার দিকেই এগোচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তার ভাষায়, যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপি বা জামায়াতের মতো একই ধাঁচের রাজনীতি করতে হয়, তাহলে আলাদা করে নতুন দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়—এ প্রশ্ন এখন অনেকের মনেই আছে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই গণআন্দোলনের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও জনগোষ্ঠীর উত্থান হয়েছিল, তাদের সংগঠিত করার প্রত্যাশা নিয়েই তিনি এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন দলটির মূল মনোযোগ অন্য দল থেকে নেতাকর্মী টানার দিকেই বেশি।

মুরসালীনের মতে, প্রকৃত অর্থে নতুন, দক্ষ ও অরাজনৈতিক পটভূমির প্রভাবশালী মানুষ এনসিপিতে আসছেন না; বরং বিভিন্ন দলের অসন্তুষ্ট বা বিচ্ছিন্ন নেতারাই বেশি যোগ দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

‘ন্যাশনাল সার্চ কমিটি’ নিয়ে ভিন্নমত

সম্প্রতি নতুন যোগদানকারীদের যাচাই-বাছাই ও সাংগঠনিক মূল্যায়নের জন্য এনসিপি একটি “ন্যাশনাল সার্চ কমিটি” গঠন করেছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের অনুমোদনে গঠিত এ কমিটিতে রয়েছেন কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।

দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কমিটির সদস্য সারোয়ার তুষার জানিয়েছেন, পুরোনো নেতাকর্মীদের ফেরানোর বিষয়টিও এই কমিটির আওতায় বিবেচনা করা হতে পারে এবং ঈদের পর এ বিষয়ে কাজ শুরু হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তবে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য, এই কমিটির মূল কাজ নতুন যোগদানকারীদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা এবং উপযুক্ত মূল্যায়নের ভিত্তিতে সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া। দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের ফেরানোর জন্য কমিটি গঠন করা হয়নি।

দলের ভেতর থেকেই এমন ভিন্নমুখী বক্তব্য এনসিপির অভ্যন্তরীণ অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

‘নতুন রাজনীতি’ নাকি পুরোনো পথ?

বিজ্ঞাপন

দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি “নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত” বা নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর কথা বললেও, বাস্তবে সেই দর্শনের সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনো সামনে আনতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতা অনেকাংশেই ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবকেন্দ্রিক। বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো বা স্বচ্ছ অর্থায়নের পরিকল্পনা ছাড়া নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

বিজ্ঞাপন

এ কারণে এনসিপি শেষ পর্যন্ত পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই আটকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংগঠন বিস্তারের প্রয়োজনে দলটি তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে দলে টানছে, যা অনেকের কাছে প্রচলিত রাজনৈতিক কৌশলের পুনরাবৃত্তি বলেই মনে হচ্ছে।

সাবেক নেতাদের অনীহা

এনসিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন জানিয়েছেন, দলের বর্তমান নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকলেও সেটিকে পুনরায় দলে ফেরার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

একইভাবে সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল বলেন, দল ছাড়ার পর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়নি।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আদর্শিক কারণেই তিনি দল ছেড়েছেন এবং সেই প্রশ্নগুলোর কোনো সমাধান এখনো হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে আবার এনসিপিতে ফেরার সম্ভাবনা নেই।

আরিফ সোহেলের মতে, আওয়ামী লীগের পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে এনসিপি এখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ভেতরে প্রবেশ করেছে। তিনি মনে করেন, দলটি ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতোই চরিত্র ধারণ করছে।

বিজ্ঞাপন

‘ক্ষমতা না জনতা’ থেকে সরে যাওয়ার অভিযোগ

সাবেক নেতাদের অভিযোগ, এনসিপি শুরুতে “ক্ষমতা না জনতা”—এই স্লোগান সামনে এনে রাজনীতিতে এসেছিল। কিন্তু এখন দলটির অবস্থান আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে।

বিশেষ করে সংসদে সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পরও এনসিপির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ না করাকে তারা রাজনৈতিক আপসের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।

বিজ্ঞাপন

তাদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে এ অবস্থান সাংঘর্ষিক। ফলে “নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত”-এর প্রতিশ্রুতি এখন অনেকের কাছে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।

দলে যোগদানের ধারাবাহিকতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দল সম্প্রসারণে আরও সক্রিয় হয়েছে এনসিপি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও পেশাজীবী মহল থেকে একের পর এক নেতাকর্মী দলে যোগ দিচ্ছেন।

এপ্রিল মাসে এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের যোগদানের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হয়। পরে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল, কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি এবং আলোচিত ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন রনিসহ আরও কয়েকজন এনসিপিতে যোগ দেন।

পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমানসহ আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব দলটিতে যুক্ত হন।

সবশেষে বিভিন্ন সংগঠন ও পেশাজীবী অঙ্গনের ৩৬ জন ব্যক্তি এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখায় যোগ দিয়েছেন।

ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

এনসিপির সাবেক নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, দলটি এখন এমন এক রাজনৈতিক পথে হাঁটছে যেখানে আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা ও সাংগঠনিক বিস্তার বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তাদের ভাষ্য, দেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন নিয়ে এনসিপির যাত্রা শুরু হয়েছিল, বাস্তবে সেই স্বপ্নের প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এনসিপি কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়েই যাবে?

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD