Logo

নির্যাতনের কথা বললে পরিবারকে গুমের হুমকি দেওয়া হয়: তানভীর

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৯
নির্যাতনের কথা বললে পরিবারকে গুমের হুমকি দেওয়া হয়: তানভীর
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগার ও রিমান্ডে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর। নির্যাতনের কথা বাইরে প্রকাশ করলে পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তানভীর। অসুস্থতার কারণে তিনি সরাসরি বক্তব্য দিতে না পারায় পরে তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।

লিখিত বক্তব্যে তানভীর বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগার ও রিমান্ডে তাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। বিষয়টি বাইরে প্রকাশ করলে পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হলেও তিনি ঘটনার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরতে এসেছেন বলে জানান।

তার ভাষ্য, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফতুন আহমেদ খান এ মামলার বাদী। ৫ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করে বগুড়ার কারাগারে নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

কারাগারের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ করেন তানভীর। তিনি দাবি করেন, তাকে এমন একটি সেলে রাখা হয়েছিল যেখানে আলো-বাতাসের ব্যবস্থা ছিল না এবং বিদ্যুৎ ও ফ্যানও ছিল না। কারাগারে তাকে বিভিন্নভাবে অপমান করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

খাবার ও চিকিৎসা নিয়েও নানা অভিযোগ করেছেন তানভীর। তার দাবি, কারাগারে থাকার সময় তাকে পচা ও খাওয়ার অনুপযোগী খাবার দেওয়া হতো। একপর্যায়ে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। পরে চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ না দিয়ে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

শরীরে অজ্ঞাত ইনজেকশন প্রয়োগেরও অভিযোগ করেন তানভীর। তার ভাষ্য, তাকে অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। একপর্যায়ে হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে ইনজেকশন দেওয়ার পর তার ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক স্ট্রোক হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করে বলে তার অভিযোগ।

তানভীর আরও দাবি করেন, হাসপাতালে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করানোর সময়ও নানা জটিলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে এমআরআই মেশিনের ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট শব্দ হয়ে মেশিনটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় অচেতন ছিলেন বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাকে ঢাকায় আনা হলেও সেখানেও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন তানভীর। তার দাবি, কেরানীগঞ্জে রাখার পর একবার হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কারাগারে নেওয়ার পথে সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি গাড়িতে ওঠেন এবং তাকে নির্যাতন করেন।

লিখিত বক্তব্যে তানভীর দাবি করেন, নির্যাতনের সময় এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সালাউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অন্যদেরও একইভাবে নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হতো।

কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, কিছু বন্দী কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভালো খাবার এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেতেন। রাতের বেলায় কয়েকজনকে গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে গিয়ে ভোরে ফিরিয়ে আনা হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর বলে দাবি করেছেন তানভীর। তিনি বলেন, প্রস্রাব-পায়খানার জন্য তাকে ব্যাগ ও প্যাড ব্যবহার করতে হচ্ছে। একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আব্দুল আহাদও তানভীরের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কথা বলেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি দাবি করেন, তানভীরের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৫০টিরও বেশি ইনজেকশন দেওয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব ইনজেকশন কে দিয়েছেন, কেন দেওয়া হয়েছে এবং কোনো চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছিল কি না—এসব বিষয়ে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

ডা. আহাদ আরও বলেন, তানভীরের শরীরে বৈদ্যুতিক শকের চিহ্নও দেখা গেছে বলে চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষায় বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তানভীরের বুকের নিচের অংশে অনুভূতি না থাকা, পা নড়াতে না পারা এবং প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসকদের বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিউরোজেনিক ব্লাডারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে ক্যাথেটার দেওয়া হয়েছে।

তানভীরের বর্তমান নিউরোলজিক্যাল সমস্যাগুলো কতটা এবং কবে পর্যন্ত স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানান ডা. আহাদ। তার মতে, বৈদ্যুতিক শকের কারণে মেরুদণ্ডের পাশাপাশি নার্ভ রুট ও পেরিফেরাল নার্ভও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ডা. আহাদ। তানভীর কীভাবে গ্রেপ্তার হন, হেফাজতে তার সঙ্গে কী ঘটেছে, শরীরে ইনজেকশন ও বৈদ্যুতিক শকের চিহ্নের কারণ কী এবং এর পেছনে কোনো চিকিৎসাগত কারণ ছিল কি না—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তানভীরের নির্যাতনের অভিযোগ এর আগেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও তাকে পুলিশ ও কারা হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন এবং তার শরীরে অজ্ঞাত ইনজেকশন প্রয়োগের দাবি করেছিলেন।

তবে তানভীরের উত্থাপিত নির্যাতনের অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD