Logo

এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯:৫৩
এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান। একই সঙ্গে দলের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নির্বাচনী কৌশল এবং রাজনীতিতে নারীর অধিকার নিয়ে নিজের আপত্তি ও হতাশার কথা তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত এনসিপির নতুন কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আগের অবস্থান থেকে পদমর্যাদা কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর কমিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। তবে সামান্তা জানিয়েছেন, শুধু কমিটিতে পদ পরিবর্তনের কারণে তিনি পদত্যাগ করছেন না। বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দলের ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে সংশয় থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে দলের অবস্থানের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর মতে, আদর্শিক ও কৌশলগত—কোনো বিবেচনাতেই জামায়াত এনসিপির উপযুক্ত রাজনৈতিক মিত্র নয়। এ ধরনের জোটের কারণে দলকে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সামান্তা আরও জানান, গত ১১ মাসে দলের কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব এবং আলোচনা করেছেন। দলের ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনে অভ্যন্তরীণভাবে মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাওয়াকে তিনি নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব মনে করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর উপলব্ধি, এনসিপির পক্ষে প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আন্তরিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

তাঁর ভাষ্য, ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে জোট থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে।

জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি

পদত্যাগের বিবৃতিতে এনসিপির রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান, আইন এবং রাজনৈতিক দল ও রাজনীতির কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাঁর মতে, দলটির দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক অসামঞ্জস্য রয়েছে। ১৯৭১ সালে ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া এবং সে অবস্থান পরিবর্তন না করার বিষয়টিও তিনি সমালোচনা করেন।

সামান্তার দাবি, জামায়াতকে সংস্কারের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করায় উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী অনেক মানুষ এনসিপির রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারায় বিভিন্ন ইস্যুতে দলটিকে জামায়াতের অবস্থানের সহায়ক ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনী কৌশল নিয়ে অসন্তোষ

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন সামান্তা শারমিন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগে সীমাবদ্ধতা থাকলেও পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা শক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল এনসিপির সামনে। প্রয়োজনে এককভাবেও নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে পারত দলটি।

তাঁর অভিযোগ, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে যুক্ত হয়ে এনসিপি নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে নির্বাচনী সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় সংস্কারের প্রশ্নে দলটির অবস্থান দুর্বল হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে শহীদ ওসমান হাদির নির্বাচনী প্রচারণার উদাহরণ টেনে সামান্তা বলেন, ওসমান হাদি কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে এককভাবে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সামান্তার দৃষ্টিতে, এ ধরনের যুক্তি অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বিজ্ঞাপন

নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন

বিবৃতিতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা এবং আন্দোলন-পরবর্তী রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান নিয়েও বিস্তর আলোচনা করেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, ওই আন্দোলনে নারীরা শুধু অংশগ্রহণই করেননি, বরং সম্মুখসারিতে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাঁদের সাহসী উপস্থিতি আন্দোলনকে সর্বজনীন রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তবে গণঅভ্যুত্থানের পর নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও এনসিপি তা কাজে লাগাতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

সামান্তা বলেন, শুধু রাজনৈতিক দলে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। নেতৃত্ব, সাংগঠনিক ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু এনসিপিও পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতো পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা থেকে বের হতে পারেনি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের রাজনৈতিক মতামত ও আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করার অর্থ দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের অভিজ্ঞতা ও দাবিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা। দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে নারীদের অধিক প্রতিনিধিত্ব, ইতিবাচক বৈষম্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি ক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনসিপি জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তির রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থানের অনুসারী হয়ে উঠেছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় নারীদের সামনের সারিতে রাখা হলেও আন্দোলনের পর তাঁদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার উপেক্ষিত হচ্ছে কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সামান্তা শারমিনের মতে, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বজায় রাখা উচিত নয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট, নির্বাচনী কৌশল, দলের আদর্শিক অবস্থান এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেই শেষ পর্যন্ত এনসিপি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD