Logo

নারীর ক্ষমতায়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ জরুরি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০:২০
নারীর ক্ষমতায়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্ব বিকাশের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান সুযোগ তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেছেন, নারীর অগ্রগতি কেবল কতজন নারী গুরুত্বপূর্ণ বা শীর্ষ পদে আসীন হয়েছেন, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। বরং তাঁদের সাফল্য অনুসরণ করে আরও কত নারী সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের নারীদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার কতটা উন্মুক্ত হচ্ছে এবং তাঁদের নেতৃত্ব সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে, সেটিই প্রকৃত অগ্রগতির মাপকাঠি।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘ওমেন লিডারশিপ সেমিনারে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর অংশ হিসেবে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) এবং ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে।

বিজ্ঞাপন

সেমিনারে নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। অথচ নানা সামাজিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁদের বড় একটি অংশ এখনো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত হতে পারছেন না। বাল্যবিয়ে, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়া নারীদের সম্ভাবনা বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে পুরুষদের অংশগ্রহণের হার ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের ৯০ হাজার ৪৯টি গ্রামের কোটি কোটি নারী এখনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের ঝরে পড়ার চিত্র তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ছাত্রী পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের হার মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা এবং পরবর্তী কর্মজীবন পর্যন্ত নারীদের জন্য ধারাবাহিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, শুধু শিক্ষাগত সনদ অর্জন করলেই নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয় না। তাঁদের সাক্ষরতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতার ভিত্তি আরও মজবুত করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন চিন্তা, প্রশ্ন করা, উদ্ভাবন এবং নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের আয়োজন শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এসব প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুরা যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, সহমর্মিতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করছে।

নারীর আর্থিক স্বাধীনতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে জুবাইদা রহমান বলেন, একজন নারীর নিজস্ব আয়, সঞ্চয় এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকেই সমৃদ্ধ করে না, বরং পুরো পরিবারের সক্ষমতা বাড়ায়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মানে কেবল উপার্জন নয়, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। এ লক্ষ্য অর্জনে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবার প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নারী ও শিশুদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নারীদের পেশাগত জীবন আরও সহজ করতে দেশজুড়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, পারিবারিক দায়িত্ব কোনো নারীর কর্মজীবন কিংবা পেশাগত উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়। কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জন এবং দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় চাকরিতে ফেরার সুযোগও নারীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে জুবাইদা রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল সেবা এবং আধুনিক প্রযুক্তি কর্মজগতের প্রচলিত কাঠামো পরিবর্তন করছে। এসব ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবননির্ভর হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। মেয়েদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষা অর্জন ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, নারীদের সাফল্য উদযাপনের পাশাপাশি তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় বাধাগুলোও দূর করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আকাঙ্ক্ষাকে সুযোগে, সুযোগকে নেতৃত্বে এবং নেতৃত্বকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাবে রূপান্তর করা সম্ভব।

সেমিনার আয়োজনের জন্য অ্যামচেম ও মার্কিন দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান জুবাইদা রহমান। পাশাপাশি আলোচনায় অংশ নেওয়া সঞ্চালক ও প্যানেল সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানার সঞ্চালনায় সেমিনারে প্যানেল স্পিকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন।

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় আরও অংশ নেন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের অ্যাক্টিং ডেপুটি চিফ অব মিশন তৃশিতা মোওলা, শেভরন বাংলাদেশের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং এবং ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD