পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হইতে চাও, তবে পীরের মহব্বত দেলে পয়দা কর

হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত ‘তাজাল্লীয়াতে জাত, তাজাল্লীয়াতে সিফাত ও তাজাল্লীয়াতে আফয়াল’ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ইয়াকীনের পরিচয়ঃ
বিজ্ঞাপন
ছায়ের অর্থ আত্মিক ভ্রমণ, আর ছুলুক অর্থ আধ্যাত্মিক পথের মঞ্জিলসমূহ অতিক্রম করা। ছায়ের ও চুলুক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কতকগুলি গুণ বা মাকাম অর্জন করা; তন্মধ্যের বেশ কয়েকটি গুণ বা মাকাম সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে। এ নসিহতের আলোচনার বিষয়বস্তু অপর একটি গুণ "ইয়াকীন" বা বিশ্বাস।
ইয়াকীন অর্থ বিশ্বাস। ইয়াকীন তিন প্রকার। যথাঃ
★ এলমুল ইয়াকীন বা জানিয়া বিশ্বাস।
বিজ্ঞাপন
★ আইনুল ইয়াকীন বা প্রত্যক্ষ বিশ্বাস।
★ হক্কুল ইয়াকীন বা তামিলোল ইয়াকীন বা প্রকৃত বিশ্বাস।
ইয়াকীন অর্থ বিশ্বাস, আবার ঈমান অর্থও বিশ্বাস। ইয়াকীন, বিশ্বাস বা ঈমান কি? প্রথমে সে বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
জাহেরী শরীয়ত পাঁচটি স্তম্ভের উপরে স্থাপিত। যথাঃ ঈমান, নামাজ, যাকাত, রোজা ও 'হজ্জ। পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ভিত্তিই হইল ঈমান বা বিশ্বাস বা ইয়াকীন। ইসলামী পরিভাষায় ঈমান বা ইয়াকীন হইলঃ খাঁটী দেলে আল্লাহর একত্বের উপরে এবং রাসূলে পাক (সাঃ) এর রেসালতের উপরে বিশ্বাস স্থাপন করা অর্থাৎ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"-এই কলেমা শরীফের আন্তরিক বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকারোক্তি এবং রাসূলে পাক (সাঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত দ্বীনের উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করিয়া আমলে ব্রতী হওয়া। পাক কালামে আল্লাহপাক বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ
الله أُولَئِكَ هُمُ الصَّدِقُونَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"পূর্ণ মোমিন তাঁহারাই যাহারা আল্লাহ ও তাহার রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন করিয়াছে। অতঃপর ইহাতে কোন সন্দেহ করে নাই। অধিকন্ত স্বীয় ধন-সম্পদ ও প্রাণ দ্বারা আল্লাহর পথে (দ্বীনের জন্য) শ্রম স্বীকার করিয়াছে-তাঁহারাই সত্যবাদী। (সূরা হুজুরাতঃ আয়াত নং-১৫)
আল্লাহপাক কুরআন মজীদে আরও বলেন,
وَ لَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتَبِ وَالنَّبِيِّنَ
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ-"বরং পূণ্য তো এই যে, কোন ব্যক্তি ঈমান রাখে আল্লাহর প্রতি, কিয়ামত দিবসের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, কিতাব ও নবীগণের প্রতি।” (সূরা বাকারাহঃ আয়াত নং ১৭৭)
ঈমান বা ইয়াকীন বিস্তৃত ও ব্যাপক এক অধ্যায়। ইহার বহু শাখা-প্রশাখা আছে। রাসূলে করীম (সাঃ) বলেন, "ঈমানের শাখা সত্তরেরও বেশী। ইহাদের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের শাখা হইতেছে পথের কাঁটা দূর করা।" তবে দয়াল নবী (সাঃ) "হাদীসে জিব্রাইলে" ঈমান বা ইয়াকীনের কয়েকটি মৌলিক শাখা বর্ণনা করিয়াছেন। ঈমান কি? এই প্রশ্নের জবাবে রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, ঈমান হইল এই যে,
★ প্রথমতঃ আল্লাহর অস্তিত্বে ও একত্বে বিশ্বাস করা।
বিজ্ঞাপন
★ ইহার পর আল্লাহতায়ালার যে সকল বার্তাবহ দূত আছেন, যাহাদিগকে ফেরেশতা বলা হয়-সেই ফেরেশতাগণের অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।
★ আল্লাহর কিতাব সমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।
★ আল্লাহর পয়গম্বরগণের উপরও পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করা।
বিজ্ঞাপন
★ তারপর ইহাও বিশ্বাস করা যে, মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হইতে হইবে এবং স্বীয় কৃতকর্মের হিসাব দেওয়ার জন্য, ভাল-মন্দ কার্যফল ভোগ করার জন্য আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হইতে হইবে।
★ ইহাও সম্পূর্ণভাবে সমর্থন ও বিশ্বাস করা যে-বিশ্বে প্রতিনিয়ত যে সকল ঘটনা সংঘটিত হইয়া থাকে উহা আমাদের পছন্দনীয় হউক বা অপছন্দীয় হউক এবং মানুষ ইচ্ছাকৃত ভাবে ভাল-মন্দ যাহা কিছু করিয়া থাকে-সবকিছুর মধ্যেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর কর্তৃত্ব রহিয়াছে এবং আদিকাল হইতেই আলেমুল গায়েব' সর্বজ্ঞ আল্লাহতায়ালার নিকট পূর্বাহ্নে ঐ সবের সঠিক তালিকাও প্রস্তুত রহিয়াছে। উল্লিখিত ছয়টি মৌলিক বিষয়ের উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান বা ইয়াকীন।
ঈমান বা ইয়াকীনের কিঞ্চিত পরিচয় উল্লিখিত আলোচনায় বিধৃত হইয়াছে। ইহার বিস্তৃত আলোচনা পুস্তকাকারে প্রকাশিত নসিহত সমূহের ৩য় খন্ডের নসিহত নং ১১ তে আকীদা শিরোনামে করা হইয়াছে। তাই এখানে পুনরায় তাহা উল্লেখ করিলাম না। এ অধ্যায়ে ইয়াকীনের বিভিন্ন স্তর এবং পূর্ণাংগ ইয়াকীন বা তামিলোল ইয়াকীন অর্জনের উপায় সম্পর্কে আলোচনাই মূল উদ্দেশ্য।
বিজ্ঞাপন
ইয়াকীনের তিনটি স্তরের বিবরণঃ
ইয়াকীনের তিনটি স্তর। যথাঃ
★ এলমুল ইয়াকীন (জানিয়া বিশ্বাস)।
বিজ্ঞাপন
★ আইনুল ইয়াকীন (প্রত্যক্ষ বিশ্বাস)।
★ হক্কুল ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস)।
কিতাব হইতে অধ্যায়ন পূর্বক অথবা গুরুজন বা শিক্ষক হইতে শুনিয়া ইয়াকীন বা ঈমানের বিভিন্ন শাখার উপরে যে বিশ্বাস জন্মে-তাহাকে 'এলমুল ইয়াকীন' বলে। আর শরীয়তে যে সকল বিষয়ের উপরে বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে-সে সমস্ত বিষয়াদি স্বচক্ষে দেখিয়া অন্তরে যে বিশ্বাস জন্মে-তাহাই "আইনুল ইয়াকীন" এবং নিজ সত্ত্বার মধ্যে কোন বিষয় সম্পর্কে যে উপলব্ধি জন্মে-তাহাই হক্কুল ইয়াকীন। এলমুল ইয়াকীন বা আইনুল ইয়াকীনের পর্যায়ে ঈমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু হক্কুল ইয়াকীনের পর্যায়ে ঈমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হইতে সুরক্ষিত। যেমন পেটে ব্যথা একটি রোগ বিশেষ। পেটে ব্যথায় ভীষণ কষ্ট হয়। আক্রান্ত রোগী যন্ত্রণায় ছটফট করে। ভুক্তভোগী ব্যক্তি পেটে ব্যথার উক্তরূপ অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এমতাবস্থায় কেহ যদি রোগীকে বলে যে, পেটে ব্যথায় আরাম বোধ হয়, ভাল ঘুম হয় তবে যেমন উক্ত রোগী তাহা কখনও বিশ্বাস করিবে না, তেমনি হক্কুল ইয়াকীনধারী ব্যক্তির ঈমান বা বিশ্বাসকে নষ্ট করার জন্য শয়তান ও নাক্স যতই প্ররোচনা বা কৌশল তাঁহার নিকট উপস্থাপন করুক না কেন-তাহা সে বিশ্বাস করিবে না। কোন শক্তিই তাঁহার ঈমানকে নষ্ট করিতে পারিবে না।
বিজ্ঞাপন
ফেরেশতা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তাঁহারা সর্বদাই আল্লাহর আদেশ পালনে রত। তাঁহারা পুরুষও নয়; স্ত্রীও নহে। তাঁহাদের সন্তান প্রসব বা বংশবৃদ্ধি নাই। তাঁহারা পয়গম্বর (আঃ) গণের নিকট 'ওহী' পৌছাইয়া থাকেন। তাঁহারা ভুল ত্রুটি হইতে সুরক্ষিত। ফেরেশতা সম্পর্কে ইত্যাকার বিশ্বাস স্থাপন শরীয়তের আদেশ। শরীয়তের উল্লিখিত আদেশ কিতাব হইতে জ্ঞাত হওয়াই এলমুল ইয়াকীনের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কোন খোদাঅন্বেষী যখন আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে দেলের পরিচ্ছন্নতা অর্জনে সক্ষম হয়-তখন আল্লাহতায়ালার সিফাতি ও আফয়ালী নূর ছালেকের কালবের আয়নায় প্রতিফলিত হয়। বিকশিত কালবী নেত্রে খোদাতায়ালার নূরের সাহায্যে ছালেক আল্লাহর ফেরেশতাদের দেখিতে পায়। ফেরেশতাদের দেখিয়া ফেরেশতা সম্পর্কিত যে বিশ্বাস তাহার অর্জিত হয়-তাহা আইনুল ইয়াকীনের অন্তর্ভুক্ত।
বেহেশত, দোযখ, পুলছেরাত ইত্যাদি সম্পর্কে কিতাব অধ্যায়ন পূর্বক অর্থাৎ ধর্মীয় শিক্ষকের নিকট হইতে শ্রবণ পূর্বক যে বিশ্বাস জন্মে-তাহা এলমুল ইয়াকীনের অধ্যায়ে নিহিত। কিন্তু বিকশিত কালবী চোখে সাধনারত ছালেক খোদাতায়ালার প্রতিফলিত সিফাতি ও আফ্যালী নূরের সাহায্যে বেহেশত, দোযখ, পুলছেরাত ইত্যাদি দর্শন করে। এমতাবস্থায় তাহার যে বিশ্বাস বা ইয়াকীন জন্মে-তাহা আইনুল ইয়াকীনের পর্যায়ভুক্ত।
এলমুল ইয়াকীন কিংবা আইনুল ইয়াকীন শয়তান ও নাফসের ধোকায় নষ্ট হইতে পারেঃ
এলমূল ইয়াকীনই হউক, আর আইনুল ইয়াকীনই হউক-নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হইতে কোনটাই সুরক্ষিত নহে। কারণ শয়তান এবং নাফস সর্বদাই মানুষকে আল্লাহবিমুখ করিয়া রাখার কাজে রত। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
অর্থাৎ- "শয়তান মানুষের প্রকাশ্য দুশমন।" (সূরা ইউসুফঃ-৫)।
আদমকে সেজদা না করিবার অপরাধে শয়তান বিতাড়িত হয়। বিতাড়িত শয়তান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে,
رَبِّ فَانْظُرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
অর্থাৎ-"হে আমার রব! আপনি আমাকে অবকাশ দিন পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।" (সূরা ছোয়াদঃ আয়াত নং ৭৯)
আল্লাহপাক শয়তানের দু'আ কবুল করিলেন এবং বলিলেনঃ
فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ
অর্থাৎ- "তুমি অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত।” (সূরা ছোয়াদঃ ৮০-৮১)
অবকাশপ্রাপ্ত ইবলিস সরল প্রাণ মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করার শপথ গ্রহণ করিল। পাক কুরআনে প্রকাশঃ
فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لاتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَ مِنْ خَلْفِهِمْ وَ عَنْ أَيْمَانِهِمْ وَ عَنْ شَمَائِلِهِمْ وَ لَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَكِرِينَ
অর্থাৎ- "সে (শয়তান) বলিল, তুমি আমার বিনাশ করিয়াছ, আমি ওঁৎ পাতিয়া থাকিব তোমার সরল পথ পথিকদের জন্য। তৎপর আমি তাহাদের নিকট পৌঁছিব তাহাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ ও দক্ষিণ হইতে; তাহাদের বাম ও ডান হইতে; তাহাদের অনেককেই কৃতজ্ঞ পাইবে না।" (সূরা আ'রাফঃ আয়াত নং ১৬-১৭)
রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "শয়তান মানুষের রক্তে চলাচল করে।" শয়তানের পক্ষে মানবদেহে আছে নাক্স। শয়তান ও নাফস যৌথভাবে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কাজে লিপ্ত। শয়তানের লক্ষ্য মানুষের ঈমানের প্রতি। যে কোন প্রকারেই হউক-মানুষের ঈমানকে নষ্ট করিতে হইবে, ইহাই শয়তানের প্রতিজ্ঞা। ঈমান আলোর দিকে পথ দেখায়; কিন্তু শয়তান অন্ধকারের দিকে লইয়া যায়। ঈমানের মুখ আলোর দিকে, শয়তানের মুখ অন্ধকারের দিকে। তাই শয়তান মানুষের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত পশ্চাতে লাগিয়া থাকে। ঈমানকে ছিনাইয়া লওয়ার কাজে রত থাকে।
কালামুল্লাহ শরীফে দেখা যায়,
وَ قَالَ لَاتَّخَذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ
অর্থাৎ-“এবং সে (শয়তান) বলিয়াছে যে, আমি অবশ্যই তোমার সেবকবৃন্দ (বান্দা) হইতে এক নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করিব এবং নিশ্চয়ই আমি তাহাদিগকে পথভ্রষ্ট করিব এবং মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করিব।" (সূরা নেসাঃ ১১৮-১১৯)
শয়তান মানুষ হইতে যে "নির্দিষ্ট অংশ" গ্রহণ করার শপথ করিয়াছে-তাহাই মানুষের ঈমান বা ইয়াকীন। কোন মানুষের সারা জীবনে যদি শয়তান ঈমান নষ্ট করিতে না পারে, তবে মৃত্যুর সময়ে অর্থাৎ শেষ নিঃশ্বাসের সময় ঈমান নষ্ট করার কাজে সে তাহার যথাসাধ্য শক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করে এবং অধিকাংশ লোকের ঈমান নষ্ট করিতে সফল হয়।
মৃত্যুক্ষণে শয়তান বিভিন্ন ছুরাতে আসিয়া মানুষের ঈমান লুণ্ঠনের চেষ্টা করে। কখনও পিতার ছুরাতে, আবার কখনও মাতার ছুরাতে আসিয়া বলে, "হে বৎস! দুনিয়াতে আমরাও আল্লাহ-রাসূলের অনুগত ছিলাম, ইসলামে দীক্ষিত ছিলাম; কিন্তু এখানে আসিয়া দেখি, ঈসায়ী ধর্ম সত্য; মুহাম্মদের ধর্ম মিথ্যা। কাজেই তুমি বল, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ঈসা রুহুল্লাহ।" আবার কখনও বলে, বাবা! দুনিয়াতে তুমি মিথ্যার মধ্যে আছ। তুমি জান, আল্লাহ এক। কিন্তু এখানে আসিয়া আমরা দেখিলাম, আল্লাহ একাধিক। কাজেই তুমি যদি তোমার ঈমান ঠিক রাখিতে চাও, তবে একাধিক আল্লাহতে বিশ্বাস কর।" শয়তান উক্তরূপ বিভিন্ন প্রকার ধোকা দিয়া ঈমানদারের ঈমানকে নষ্ট করে।
এখানে ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেবের মৃত্যুকালের কাহিনী উল্লেখযোগ্য। ফখরুদ্দিন রাজী (রাঃ) ছাহেব জাহেরা এলেমে একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। আল্লাহর একত্বের উপর বা তওহীদের উপর শতাধিক দলিল তিনি রচনা করিয়াছিলেন। এলমুল ইয়াকীন পুর্ণমাত্রায় তাঁহার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এলমুল ইয়াকীনের ভিত্তিতো তেমন মজবুত নহে। শয়তানের দাগাবাজী বা কৌশলের নিকট এলমুল ইয়াকীন তেমন কার্যকরী ভূমিকা রাখিতে সক্ষম নয়। ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেবের জীবন হইতে তাহা জানা যায়। "জামেউৎ তাফসীর"-এর সূরা মুহাম্মদের ব্যাখ্যায় নিম্নের ঘটনাটির বিবরণ পাওয়া যায়।
একদা ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেব সমকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ হযরত নজিবুদ্দিন কোবরা (রঃ) ছাহেবের নিকট মুরীদ হওয়ার জন্যে যান। তাঁহার সংগে তখন তিনশত জন বিজ্ঞ আলেম। তিনি মুরীদ হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। কিন্তু নজিবুদ্দীন কোবরা (রঃ) ছাহেব তাঁহাকে মুরীদ না করিয়া বরং বলিলেন, "বাবা, আমি আপনাকে মুরীদ করিব না। কারণ আপনার নিজেরই তিনশত জন খাদেম প্রয়োজন হয়। তবে আপনাকে একটি উপদেশ প্রদান করিতেছি। যদি কখনও আপনি কোন বিপদে পড়েন; তবে এই ফকীরকে স্মরণ করিবেন।" ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেব বিদায় গ্রহণ করিলেন। ইহার কিছুদিন পরের কথা। ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেবের শেষ সময় উপস্থিত। শয়তান ইমাম ছাহেবের ঈমান নষ্ট করার শেষ চেষ্টা ও কৌশল প্রয়োগ করিল। সে ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেবের নিকট আল্লাহর একত্বের অসত্যতা সম্পর্কীয় বিভিন্ন দলিল উপস্থাপন করিল। ইমাম রাজী (রঃ) ছাহেব একে একে আল্লাহর একত্বের উপরে তাঁহার রচিত শতাধিক দলিল উপস্থাপন করিলেন; কিন্তু শয়তানের বুদ্ধি ও কৌশলের নিকট তাঁহার কোন দলিলই আর টিকিল না। ইমাম ছাহেবের ঈমান যায় যায় অবস্থা। বিপদগ্রস্থ ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেবের হঠাৎ স্মরণে পড়িল নজিবুদ্দিন কোবরা (রঃ) ছাহেবের উপদেশের কথা। তিনি বলিয়াছিলেন, "বাবা, বিপদে পড়িলে আমাকে স্মরণ করিও।" ফখরুদ্দিন রাজী নজিবুদ্দিন কোবরা (রঃ) ছাহেবকে স্মরণ করিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি দেখিলেন, তাঁহার সম্মুখে দন্ডায়মান ছফেদ পোশাক পরিহিত, নূরানী চেহারার অধিকারী হযরত নজিবুদ্দিন কোবরা (রঃ) ছাহেব। তিনি তাহাকে বলিতেছেন, "হে ফখরুদ্দিন। তুমি বল, বিনা দলিলে আল্লাহ এক।" হযরত ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) যেইমাত্র বলিলেন বিনা দলিলে আল্লাহ এক, তখনই শয়তান দ্রুত পলায়ন করিল। ইমাম ছাহেবের ঈমান রক্ষা পাইল।
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী (রঃ) ছাহেব তখনই আল্লাহতায়ালার নিকট প্রার্থনা করিলেন, "হে আমার প্রতিপালক! দয়া করিয়া আমাকে কিছুক্ষণ সময় দিন যাহাতে এই ঘটনাটি আমি বলিয়া যাইতে পারি।" আল্লাহতায়ালা তাহার দু'আ কবুল করিলেন। তাহার জ্ঞান আসিল। তিনি চক্ষু উন্মিলিত করিয়া তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট বেশ কিছু বিজ্ঞ আলেম দেখিতে পাইলেন। তিনি তাহাদের নিকট সমুদয় ঘটনা ব্যক্ত করিয়া বলিলেন,
مَنْ لَيْسَ لَهُ شَيْخُ فَشَيْخُهُ الشَّيْطَانُ
অর্থাৎ-'যাহার পীর নাই, তাহার পীর শয়তান।'
উপরের আলোচনায় একটি বিষয় অন্ততঃ স্পষ্ট হইল যে, এলমুল ইয়াকীনের ভিত বড় দুর্বল। যে কোন সময় এই ইয়াকীন বা ঈমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এলমুল ইয়াকীনের পর্যায়ে ঈমানকে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হইতে মুক্ত রাখা যেমন দুষ্কর; তেমনি আইনুল ইয়াকীনের পর্যায়েও ঈমানকে নিরাপদে রাখা কঠিন। আইনুল ইয়াকীন অর্থ দেখিয়া বিশ্বাস। দেখার মধ্যেও ধুর্ত শয়তান তাহার হেকমত খাটায়।
প্রাসংগিক বিধায় একটি মেজিকের ঘটনা এখানে উল্লেখ করিতেছি। ব্রিটিশ আমলের কথা। তৎকালীন সময়ের এক প্রখ্যাত মেজিসিয়ানের মেজিক দেখার জন্য জেলা মেজিস্ট্রেট ও কতিপয় ব্রিটিশ কর্মকর্তাসহ বহু লোক একটি নির্দিষ্ট হলরুমে উপবিষ্ট আছেন। সকাল দশটায় মেজিক দেখানোর কথা। সকলেই ৯:৩০ মিনিট হইতে মেজিসিয়ানের অপেক্ষায় বসা আছেন। দশটার ঘন্টা পড়িল। মেজিসিয়ানের কোন খবর নাই। ১০:১৫ মিনিট পার হইল। তখনও মেজিসিয়ান আসিল না। ইহা দৃষ্টে উপস্থিত উৎসুক দর্শকেরা সকলেই ক্ষিপ্ত। ১০ঃ৩০ মিনিট পার হইল। তখন অনেক দর্শকেরই ধৈর্যের বাঁধ ভাংগিল। কেহ কেহ হল রূম ত্যাগ করিতে শুরু করিল। ঠিক এমন সময় ধীর পদক্ষেপে মেজিসিয়ান হলরুমে ঢুকিয়া মঞ্চে উঠিল। ক্রুদ্ধ জেলা মেজিস্ট্রেট মেজিসিয়ানকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আপনার কখন মেজিক দেখানোর কথা?" উত্তরে মেজিসিয়ান বলিলেন, "সকাল দশটায়।" মেজিস্ট্রেট জিজ্ঞাসা করিলেন, "এখন কয়টা বাজে?” মেজিসিয়ান বলিলেন, "এখনও দশটা বাজিবার ১৫ (পনের) মিনিট বাকী আছে।" সকলেই আপন আপন ঘড়ির দিকে তাকাইয়া দেখিলেন যে, প্রত্যেকের ঘড়িতেই তখন দশটা বাজিবার পনের মিনিট বাকী আছে। মূলতঃ ইহা ছিল সেই মেজিসিয়ানের সেই দিনের প্রথম মেজিক-যাহা দৃষ্টে সকলেই হতভম্ব হইলেন।
একজন মেজিসিয়ান বা যাদুকরের যে শক্তি-তাহার চেয়েও বহু গুণ শক্তি ও কৌশল আছে শয়তানের। কোন ছালেক যখন তরিকতের রাস্তায় অগ্রসর হইতে ব্রতী হয়, কঠোর তপস্যা করে, অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা অন্তে কালবের ময়লা পরিস্কারকরণে সক্ষম হয়; শয়তান তাহাকে লাইনচ্যুত করিবার জন্য আদা-লবন খাইয়া নামে। তেমন অবস্থায় ছালেককে প্রতি পদক্ষেপে আপন পীরের প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হয় এবং শরীয়তের মানদন্ডে সবকিছুকে বিচার করিতে হয়।
সাধনারত ছালেকের পরিচ্ছন্ন কালবে খোদাতায়ালার নূর আসে। তাহার হৃদয় প্রশস্ত হয়। কালবের আয়নার ছালেক সমগ্র সৃষ্টি জগত দেখে। আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, বেহেশত-দোযখ, আসমান-যমীন সবই তাহার কালবে পরিলক্ষিত হয়। "অফি আনফুছেকুম, আফালা তুছেরুন" অর্থাৎ আমার নিদর্শন তোমাদের মধ্যেই আছে-তোমরা দেখা না কেন?-কালামুল্লাহ শরীফের এই আয়াত পাকের নূরে খোদাতায়ালার অপূর্ব নিদর্শনাদি দেখিয়া ছালেকের আইনুল ইয়াকীন হাছিল হয়। কিন্তু শয়তানের অপতৎপরতায় ঈমানদারের আইনুল ইয়াকীনও নষ্ট হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। জাহেরীতে শয়তান যতখানী ধোকা দেয়, বাতেনীতে শয়তান ইহার চেয়েও হাজারগুণ অধিক ধোকা দেয়। এতদ্ব্যতীত আছে নাফসের স্বভাবগতদোষ, নাফসের আল্লাহ বিরোধিতা।
বাতেনীতে শয়তান কিভাবে ধোকা দেয়, ইহার দুই একটি দৃষ্টান্ত এখানে তুলিয়া ধরিতেছি। একদা গউসপাক (রঃ) ছাহেব গভীর ধ্যানে নিমগ্ন। মোরাকাবা রতাবস্থায় হঠাৎ তিনি দেখিতে পান যে, সমুদয় আকাশ আলোতে আলোকিত। নূরময় আকাশে নূরানী এক আসনে উপবিষ্ট এক ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত গাম্ভির্যের সহিত তাঁহাকে বলিতেছেঃ "হে মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের! তোমার ইবাদতে ও সাধনা দৃষ্টে আমি অতীব খুশী। শরীয়ত পালনের দায়-দায়িত্ব হইতে তোমাকে অব্যাহতি দিলাম। শরীয়তের আমল তোমাকে না করিলেও চলিবে।" গউসপাক (রঃ) ছাহেব দুশ্চিন্তায় পড়িলেন। ভাবিলেন, শরীয়তের আমল প্রতিপালন হইতে শ্রেষ্ঠতম মানব রাসূলে পাকও (সাঃ) অব্যাহতি পান নাই, অন্য কোন নবী-রাসূল (আঃ) গণও অব্যাহতি পান নাই। কোন ওলী-আল্লাহও নিষ্কৃতি পান নাই। শরীয়তই হইল শয়তানের প্রবঞ্চতা হইতে বাঁচিবার চাবিকাঠি। ভাবিলেন, নিশ্চয় ইহা শয়তানী ধোকা বই কিছু নহে। তিনি তৎক্ষণাৎ পড়িলেন, "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লা হিল 'আলিয়্যুল 'আজিম।" সংগে সংগে শয়তান অদৃশ্য হইয়া গেল। কিছুক্ষণ বাদে মানবরূপে আসিয়া আবার তাঁহাকে বলিল, "হে আব্দুল কাদের! আপনাকে যে পথে ধোকা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছিলাম, সেই একইভাবে বহু সাধককে পথভ্রষ্ট করিতে সক্ষম হইয়াছি। তাহাদের ঈমানরূপ সম্পদকে ধ্বংস করিতে সফল হইয়াছি। কিন্তু আপনাকে পারিলাম না। আপনার জ্ঞান আপনাকে রক্ষা করিল।" হযরত গউস পাক (রঃ) ছাহেব তৎক্ষণাৎ শয়তানকে বলিলেন, "হে ইবলিস! তুই আবার আমাকে ধোকা দিতে আসিয়াছিস। আমার জ্ঞান আমাকে রক্ষা করে নাই। আমাকে রক্ষা করিয়াছেন স্বয়ং খোদাতায়ালা।" ইহা শুনিবামাত্র শয়তান দ্রুত প্রস্থান করিল।
মূলতঃ হযরত গউসপাক (রঃ) ছাহেবের ঈমান ছিল হক্কুল ইয়াকীন বা তামিল্লোল ইয়াকীন পর্যায়ের। সে কারণে এক শয়তান কেন, শত শয়তান একত্রেও তাঁহার ঈমানের ক্ষতি করিতে পারিত না। কিন্তু আইনুল ইয়াকীনধারী বহু সাধকের ঈমান বা বিশ্বাসরূপ সম্পদকে যে শয়তান নষ্ট করিতে সক্ষম-তাহা উল্লিখিত কাহিনী হইতে সহজেই বোধগম্য হয়।
হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেবের এক মুরীদ দীর্ঘদিন পীরের কদমে খেদমত করিবার কারণে তাহার (মুরীদের) ইয়াকীন এলমুল হইতে আইনুল পর্যায়ে পৌঁছায়। সেই মুরীদ কাশফের (অন্তর্দৃষ্টির) মাধ্যমে অদৃশ্য জগতের বহু কিছুই দেখিত। কিন্তু তাহার নাফস পরিশুদ্ধ না হওয়াতে এবং ইয়াকীন হক্কুল পর্যায়ে না পৌঁছানোর কারণে সে শয়তানের ওয়াসওয়াসা হইতে মুক্ত ছিল না। একদা তাহার মধ্যে এক শয়তানী খেয়াল মাথাচাড়া দিয়া উঠে। সে ভাবে, "আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইয়াছে। আর পীরের খেদমত আমার প্রয়োজন নাই।" ইহা ভাবিয়া পীরের কদম ত্যাগ পূর্বক সে নিজেই পীর-মুরীদী করা শুরু করে। চারা কলা গাছের বুক ফারিয়া যদি কলার ছড়া বাহির হয়, তবে সে কলা পোক্তও হয় না, ছোপও বালা (নষ্ট) হইয়া যায়। জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেবের উক্ত মুরীদের অবস্থাও তাই হইল। সে শয়তানের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হইল। ইবলিস তাহাকে লইয়া এক অদ্ভুত খেলা শুরু করিল। সে প্রতি রাত্রে স্বপ্নে দেখিত যে, তাহার জন্য ফেরেশতাগণ উট লইয়া আসিয়া বলিত, চল, তোমাকে বেহেশতে লইয়া যাইবার জন্য আসিয়াছি। তখন সে উটে চড়িয়া তাহাদের সংগে এমন এক মনোমুগ্ধকর স্থানে যাইয়া পৌঁছিত যে, সেখানে বহু সুদর্শন ও খুব ছুরাত লোকের সমাবেশ হইত। উত্তম ও সুস্বাদু খাদ্য সামগ্রী প্রস্তুত, সম্মুখে সুপেয় পানির নহর প্রবাহিত। সে স্বপ্নযোগেই সেই মনোরম স্থানে নামিয়া পড়িত এবং বহুক্ষণ তথায় অবস্থান করিয়া সবই উপভোগ করিত। অবশেষে জাগিয়াই দেখিত যে, সে তাহার ইবাদত ঘরেই আছে।
শয়তানী ওয়াসওয়াসায় তাহার খেয়াল এই পর্যায়ে পৌছাইল যে, সে নিজেই লোকের নিকট প্রকাশ করিতে লাগিল, "আমি এমন উন্নত পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছি যে, প্রতি রাত্রে আমাকে ফেরেশতাগণ আসিয়া বেহেশতে লইয়া যায় এবং সেখানে এইরূপ এইরূপ ঘটনা হয়।" একদা এই খবর হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেবের কান পর্যন্ত পৌছাইল। পীর কখনই চান না যে, মুরীদ ধ্বংস হউক। তাই একদা হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব তাঁহার উক্ত মুরীদের আস্তানায় গেলেন। দেখিলেন যে, সেই মুরীদ খুব শান-শওকতের সাথে মুরীদানসহ বসিয়া আছে। তিনি মুরীদের অবস্থা জানিতে চাহিলেন। লাইনচ্যুত মুরীদ আদ্যোপান্ত সবই খুলিয়া বলিলেন। তখন হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব মুরীদকে বলিলেন, "বাবা! আজ রাত্রে তুমি যখন তোমার সেই কথিত বেহেশতে পৌঁছাইবে-তখন তুমি তিনবার পড়িও, "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল 'আলিয়্যুল 'আজিম”। উপদেশ প্রদানান্তে পীর হযরত জোনায়েদ বোগদাদী (রঃ) ছাহেব চলিয়া গেলেন। মুরীদ আজও পূর্বের মতই ঘুমে অচেতন হইলে যথারীতি তাহাকে নেওয়ার জন্য উট আসিয়া হাজির হইল। সে তাহাতে
ছওয়ার হইয়া তাহার তথাকথিত বেহেশতে যাইয়া পৌঁছিল। পীরের কথায় তাহার বিশ্বাস ছিল না, তথাপিও তাঁহার শিখানো দু'আ পরীক্ষাচ্ছলেই সে পড়িল। কলেমাটি উচ্চারিত হওয়ামাত্রই উপস্থিত সকলেই প্রমোদ আসর ভাংগিয়া তাহাকে একাকী ফেলাইয়া চিৎকার করিতে করিতে যে যেদিকে পথ পাইল পালাইয়া গেল। অতঃপর সে দেখিতে পাইল যে, সে একটি ঘোড়ার উপর বসিয়া আছে। আর তাহার মুরীদগণের হাড্ডি তাহার সম্মুখে রাখা আছে। ইহা দেখিয়া সে চকিয়া উঠিল ও নিজের ভুল বুঝিতে পারিয়া তওবা করিল। তাহার লুপ্তপ্রায় ইয়াকীন ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা পাইল।
কাজেই বুঝা গেল, এলমুল ইয়াকীনই হউক, অথবা আইনুল ইয়াকীনই হউক-শয়তানের প্রবঞ্চনা ও নাফসের ধোকায় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হইতে কোনটাই মুক্ত নহে। কাজেই সাধনা দ্বারা ইয়াকীনকে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করা প্রয়োজন যেখানো শয়তানের কোন ওয়াসওয়াসা পৌছাইতে পারে না। ইয়াকীনের সেই স্তরকে বলা হয় হক্কুল ইয়াকীন বা প্রকৃত বিশ্বাস। বিশ্বাসের এই স্তরকেই বলা হয় হাকীকী ঈমান বা তামিলোল ইয়াকীন। এখানে উল্লেখ্য, এলমুল ইয়াকীনকে বলা হয় ছুরাতে ঈমান।
এখন জানা প্রয়োজন, কোন্ পর্যায়ে একজন ঈমানদারের হাকীকী ঈমান বা হক্কুল ইয়াকীন অর্জিত হয় এবং কিভাবে হাছিল হয়?
ঈমান বা ইয়াকীনের শ্রেষ্ঠতম শাখা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। এই কলেমার জেকেরের মূল উদ্দেশ্যই হইল-উপাস্যতুল্য উদ্দেশ্যসমূহকে নফি (অস্বীকার) করা। "লা”-এর তলোয়ারে বাতিল মাবুদসমূহকে কাতেল করা। বাতিল মাবুদসমূহ দুই প্রকার। যথাঃ আফাকী বা প্রকাশ্য এবং আনফুসী বা গুপ্ত। আফাকী মাবুদসমূহ হইল কাফের বা বিধর্মীদের দেব-দেবী।
কুরআন শরীফে এমন বহু আফাকী বাতিল মাবুদের কথা উল্লেখ আছে। যেমন সূরা নাজুমের ১৯ ও ২০ আয়াতে আছে লাত, উজ্জা ও মানাত সম্পর্কে। সূরা নূরের ২৩ আয়াতে আছে আরও কিছু প্রতিমার কথা। যেমন ওয়াদ (শক্তির দেবতা), সূওয়া (নারী মূর্তি প্রতিমা), ইয়াগুছ (বর্বর শক্তির দেবতা) ইয়া'উক (অশ্বমূর্তি প্রতিমা) ইত্যাদি। পূর্ব জামানার মানুষ উল্লিখিত বিভিন্ন নামের প্রতিমার পূজা বা উপাসনা করিত। বর্তমানে বিধর্মীরা তেমনি বিভিন্ন মূর্তির পূজা করে। কেহবা আবার অগ্নিপুজা করে, কেহবা বৃক্ষপূজা করে ইত্যাদি। কিন্তু ইসলামে ইত্যাকার আফাকী মাবুদসমূহকে বাতিল বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। যাহারা আফাকী শিরক হইতে মুক্ত, তাহাদের ঈমানকে ছুরাতে ঈমান বা ইয়াকীন বলা হয়।
আফাকী মাবুদ ছাড়াও আরও কিছু মাবুদ বা উপাস্য আছে-যেমন খাহেশাতে নাফস ও শয়তান। খাহেশাতে নাফস আনফুসী উপাস্যতুল্য-সে প্রসংগে আল্লাহপাক বলেন,
أَفَرَتَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ الهَهُ هَوَهُ
অর্থাৎ- "আপনি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা দেখিয়াছেন, যে নিজের প্রবৃত্তিকে অর্থাৎ খায়েশাতে নাফসকে তাহার মাবুদ বা উপাস্য সাব্যস্ত করিয়াছে?" (সূরা জাসিয়াহঃ ২৩)
তাই দেখা যায়, আবেদ যখন নামাজে দন্ডায়মান হয়, কত রাজ্যের দুনিয়াবী চিন্তা তাহার কালবে আসিয়া ভিড় জমায়। তাহার মন সেই দিকে ঘুরিয়া যায়। যদিও নামাজি মুখে বলে, "সুবহানাকা রাব্বিয়াল আলা" তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করিতেছি] অথবা বলে "ইয়াকা না'বুদু [আমরা তোমারই বন্দেগী করিতেছি; কিন্তু অন্তরে থাকে তাহার হাজারও দুনিয়াবী চিন্তা। কত পুরাতন বন্ধুর স্মৃতি, কত মামলা-মকদ্দমার কথা তাহার মনকে আচ্ছন্ন করে। নামাজীর এই ধরণের শিরককে "আনফুসী শিরক" বলা হয়। কারণ আল্লাহকে ভুলাইয়া নামাজীর দেলে বিভিন্ন চিন্তার তীর নিক্ষেপ করে শয়তান ও নাফস।
এই প্রসংগে রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন তাহার নিকট শয়তান আসে এবং তাহাকে এত দূর ধোকা দেয় যে, তাহার মনে থাকে না যে, সে কয় রাকাত নামাজ পড়িয়াছে। (সহী বোখারী ও মোসলেম শরীফ)
কাজেই হক্কুল ইয়াকীন অর্জন করিতে হইলে আফাকী মাবুদসমূহের মত আনফুসী মাবুদসমূহকেও "লা"-এর তলোয়ার কাতেল করিতে হইবে। বাতিল আনফুসী উপাস্য সমূহকেও অস্বীকার করিতে হইবে। এই জন্য প্রয়োজন নাফসের শোধন, নাফসের শুদ্ধি। নাফস স্বভাবগতভাবে খোদাদ্রোহী, আল্লাহবিরোধী। নাফসকে তাহার এই স্বভাবধর্ম হইতে মুক্ত করিতে হইবে। নাফসকে এমিনান বা প্রশান্তির
মাকামে উন্নীত করিতে হইবে, নাফসে মোৎমাইন্ন্যায় পৌঁছাইতে হইবে। তবেই হক্কুল ইয়াকীনের ঘ্রাণ আসিবে। অতঃপর ফানা বা বাকা লাভের পর নাফস মোলহেমায় পৌঁছাইলে তখনই পূর্ণ হক্কুল ইয়াকীন বা হাকীকী ঈমান ছালেকের সিদ্ধ হইবে।
তাহা কিভাবে সম্ভব? ইহা সম্ভব যদি বেলায়েতের মাকাম হাছিল করা যায়। বেলায়েতের প্রথম মাকাম "বেলায়েতে ছোগরা।" ছালেক যখন বেলায়েতে ছোগরায় পৌঁছায় তখন আল্লাহতায়ালার আসমা ও সিফাতের প্রতিবিম্বের নূরে তাহার অজ্ঞানতা আসে। আল্লাহ ব্যতীত সবকিছুই সে বিস্মৃত হয়। ফলে তাহার ফানা সিদ্ধ হয়। অবশ্য ইহা ফানার ছুরাত। এখান হইতে আরও ঊর্ধ্বে বেলায়েতে কোবরায় যখন ছালেক প্রবেশ করে, তখন সে তাঁহার গুণাগুণ একে একে সবই আল্লাহকে ফেরত দেয় এবং তাঁহার আদামাতও ঝরিয়া পড়ে। ফলে সিফাতে হাকীকীর নূরে তাঁহার ফানা সিদ্ধ হয়। তাহার নাফস পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু নাফসের উৎস আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস তখনও অপবিত্র থাকে। উক্ত উপাদান চতুষ্টয় যতক্ষণ পবিত্র না হয়, ততক্ষণ দেহও পাক হয় না। ফলে নাফস অনুগত হইলেও দেহের আগুন আল্লাহর অনুগত হয় না। আগুনের স্বভাব অন্যের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা। ইবলিস আগুনের তৈরী বিধায় আগুনের স্বভাবদোষের চাপে সে নিজেকে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করিয়া আল্লাহর আদেশ অমান্য করিয়াছিল-যাহা ছিল তাহার অধঃপতনের কারণ। তাই মানুষের দেহের আগুনের অংশ যতক্ষণ পবিত্র না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান বা ইয়াকীন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হইতে নিরাপদ নয়। কারণ "আনা খায়রুম" (আমি শ্রেষ্ঠ)-এর অনুভূতি যে কোন সময় ছালেককে লাইনচ্যুত করিতে পারে। দেহের আগুনের স্তর পবিত্র হয় বেলায়েতে উলিয়া নামক দায়েরাতে, জাত মিশ্রিত সিফাতি নূরের অবিরাম প্রবাহে। আর মাটির স্তর পবিত্র হয় আরও এক ধাপ উপরে কামালাতে নবুয়তের দায়েরাতে তাজাল্লীয়াতে জাতি নূরের বিরামহীন প্রবাহে। মূলতঃ জাতি নূরের কারেন্টে মানব দেহের সমুদয় উপাদান পাক হয়। দেল ও নাফস যেমন এই স্তরে খোদার অনুগত হয়, তেমনি দেহও খোদার অনুগত হয়। দেল, দেহ ও নাফস-সবই ইসলামী ফিত্রাতে আসে। দেল, দেহ, মন, প্রাণ ও নাফস সবসহ ছালেক নিজেকে খোদাতায়ালার ইচ্ছাতে ন্যস্ত করে। তাহার তসলিম-এর গুণ সিদ্ধ হয়। সত্যিকার অর্থে সে মুসলমান হয়। এই স্তরের ইসলামই খাছের খাছ ইসলাম। এই স্তরের ইসলাম পরিপূর্ণ ইসলাম। এই স্তরের ঈমানই প্রকৃত ঈমান বা হাকীকী ঈমান বা হক্কুল ইয়াকীন। শয়তানের কোন মন্ত্রণা এখানে প্রবেশ করিতে পারে না। নাফস নিজেই এখানে মুসলমান, খোদার প্রেমিক। রাসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছিলেন, "আসলামা শায়তনী" অর্থাৎ আমার শয়তান মুসলমান হইয়াছে-এই কথার মর্মার্থ উক্ত স্তরের দিকেই ইংগিত করে। কারণ তখন নাফস যেমন পাক হয়, দেহের উপাদানসমূহও পবিত্র হয়। দেহের উপর শয়তানের যেমন মন্ত্রণা চলে না, নাফসের উপরও তেমনি শয়তানের চাল খাটে না। এই স্তরের ঈমান যেমন হাকীকী ঈমান, তেমনি এই স্তরের ইসলামও হাকীকী ইসলাম। এলমুল ইয়াকীন যেমন ঈমানের ছুরাত; তেমনি এলমুল ইয়াকীন স্তরের মুসলমানও ছুরাতে ইসলামের অনুসারী। আল্লাহপাক কুরআন মজীদে ফরমান,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقتِهِ وَ لَا تَمُوتُنَّ الا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
অর্থাৎ-“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে তোমরা যথাযথ ভয় কর, সাবধান! মরিও না তোমরা মুসলমান না হইয়া।" (সূরা আলে ইমরানঃ ১০২)
আল্লাহপাক আরও বলেন,
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السَّلْمِ كَافَّةً
অর্থাৎ-“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হও।" (সূরা বাক্বারাঃ ২০৮)
আল্লাহপাক অন্যত্র আরও বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَ الْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُوْلِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ
অর্থাৎ-"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের, তাহার রাসূলের নিকট অবতীর্ণ কিতাবের ও তৎপূর্বে তাহার অবতীর্ণ কিতাবের উপর ঈমান আনয়ন কর।" (সূরা নেসাঃ ১৩৬)
এখানে তিনটি আয়াতপাক উল্লেখ করা হইল। তিনটি আয়াতের প্রথমটিতে আল্লাহপাক ঈমানদারগণকে (মুসলিমদেরকে) উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছেন যে, তোমরা মুসলমান না হইয়া মরিও না। যাহার মর্মার্থ দাঁড়ায়ঃ হে এলমূল ইয়াকীনধারী বা ঈমানের ছুরাতধারী সাধারণ মুসলমানেরা! তোমরা তোমাদের ঈমানকে ছুরাত হইতে হাকীকীর দিকে লইয়া যাও, যেখানে পৌঁছাইলে তোমার দেল, দেহ ও নাফস সবই খোদার অনুগত হইবে। তুমি সত্যিকার মুসলমান হইতে পারিবে। তোমার ইসলাম পূর্ণতা পাইবে। (দ্বিতীয় আয়াতের ইশারা)। তখন তোমার ঈমান হইবে যথার্থ ঈমান। নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনামুক্ত হাকীকী ঈমান। আল্লাহপাক তাই ঈমান আনয়নকারীদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, "হে মোমিনগণ! তোমরা ঈমান আন।" (তৃতীয় আয়াতের ইশারা)
হক্কুল ইয়াকীন অর্জনের উপায়ঃ
হক্কুল ইয়াকীন অর্জনের উপায় কি? হক্কুল ইয়াকীন অর্জনের জন্য প্রয়োজন, দেলে মহব্বতে জাতি পয়দা করা অর্থাৎ আল্লাহপাককে নিজের প্রাণ অপেক্ষা অধিক ভালবাসা। খোদার প্রতি মহব্বত জাতি পর্যায়ে নিতে হইলে প্রয়োজন রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ অনুসরণ তথা নবীজী (সাঃ) এর পরিপূর্ণ মহব্বত অর্জন করা। আল্লাহতায়ালা পাক কালামে দয়াল নবী (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন,
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ط وَ اللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٍ
অর্থাৎ-"[হে রাসূল] আপনি বলুনঃ তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, তাহা হইলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসিবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আলে ইমরানঃ ৩১)
অনুসরণের জন্য মহব্বত শর্ত। মহব্বত দেলে পয়দা হইলে আপনা হইতেই অনুসরণের যোগ্যতা পয়দা হয়। তাই রাসূলে পাক (সাঃ) এর মহব্বতকে ঈমানের মানদন্ড বলিয়া হাদীস পাকে উল্লেখ করা হইয়াছে। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেন, "তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি মোমিন হইতে পারিবে না, যে পর্যন্ত আমি তাহার নিকট তাহার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও সকল লোক অপেক্ষা অধিক প্রিয় না হই।" (সহী বোখারী)
কিন্তু রাসূলে পাক (সাঃ) এর পরিপূর্ণ মহব্বত ও অনুসরণের যোগ্যতা রূপ নেয়ামত লাভ করিতে হইলে প্রয়োজন কামালতে নবুয়তের মাকাম হাসিলকারী ওলীয়ে কামেলের পূর্ণ মহব্বত ও পূর্ণ অনুসরণ।
কাজেই হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা যদি হক্কুল ইয়াকীন বা হাকীকী ঈমান লাভ করিতে চাও, মরণের পূর্বে মুসলমান হইতে চাও, পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হইতে চাও, তবে পীরের মহব্বত দেলে পয়দা কর। পীরে কামেলের প্রতি জাতি মহব্বত দেলে পয়দা হইলে আল্লাহ ও রাসূলের জাতি মহব্বত তোমাদের দেলে পয়দা হইবে। ফলে মহব্বতে জাতির টানে তোমরা ওলীর দরজায় পৌঁছাইতে পারিবে। তোমাদের ঈমান হাকীকী পর্যায়ে পৌঁছাইবে-যে ঈমান বা ইয়াকীন শয়তানের প্ররোচনায় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হইতে সুরক্ষিত থাকিবে। তোমাদের আর কোন ভয় থাকিবে না। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন শরীফে বলেন, أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ
অর্থাৎ-"জানিয়া রাখ! নিশ্চয়ই যাহারা আল্লাহর ওলী, তাঁহাদের না আছে কোন ভয় এবং না আছে কোন চিন্তা।" (সূরা ইউনুসঃ ৬২)





