ডিপিডিসির বিদ্যুৎকর্মীর লাশ নিয়ে প্রকৌশলীর চাঁদাবাজি

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে উচ্চ ভোল্টেজের সঞ্চালন লাইনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ সন্তানের জনক মো. নজরুল ইসলাম (৫৫)। কিন্তু এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয় এর আড়ালে লুকিয়ে আছে দায়িত্বহীনতা, সুপরিকল্পিত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং তদন্ত ম্যানেজ করতে মোটা অঙ্কের টাকার দরকষাকষি।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের ভেতর থেকে উঠে আসা তথ্যগুলো এক ভয়াবহ অন্ধকার জগতের দরজা খুলে দিচ্ছে যেখানে দুর্নীতি, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিত্যদিনের ব্যাপার।
গত ২৬ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ ডাইরেক্ট ওভারহেড বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে (ফিডার) রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছিলেন নজরুল ইসলাম। হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। আহত হন আরও দুজন সহকর্মী। কিন্তু এই মৃত্যুর পর যা ঘটেছে, তা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। দুর্ঘটনার চার ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়নি। ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী, ফিডার ইনচার্জ উপ সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান সোহাগ ও সহকারী প্রকৌশলী মো. রাহুল পুরো ঘটনাটি চেপে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফেসবুকে নিহতের রক্তাক্ত ছবি এবং ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান তখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা।
সূত্র বলছে, মৃত্যুকে পণ্য বানানোর চেষ্টা করছে এই চক্র। মৃত্যুদুর্ঘটনার পর ডিপিডিসি সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের ভেতর থেকে যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা রীতিমতো হতবাক করার মতো।
বিজ্ঞাপন
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, তদন্তকে প্রভাবিত করতে এবং নিজেদের দায় এড়াতে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল রহমান সোহাগের ওপর পুরো দায়ভার চাপানোর চেষ্টা করেন। চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
অভিযোগ সূত্র বলছে, প্রথমে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন অমিত অধিকারী। আব্দুল রহমান সোহাগ যখন ১০ লাখ টাকায় রাজি হন, তখন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়। বরং তাঁকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয় মৃত কর্মীর পরিবারকে ৭ লাখ টাকা দিতে হবে এবং তদন্ত কমিটিকে ‘ম্যানেজ’ করতে লাগবে আরও ২০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে দরকষাকষির অঙ্ক গিয়ে ঠেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকায়।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনা প্রকৌশলী আব্দুল রহমান সোহাগ তার এক বন্ধু সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেন বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার একটা ব্যবসা খুলে বসেছেন। আমি জানি না, কিভাবে আমাদের সহকর্মীর মৃত্যু হলো। এখন দায় আমার ওপর চাপাচ্ছেন। আমার ভুলে নাকি এই ঘটনা ঘটেছে। যদি আমার ভুল হয়। তাহলে এই দায় নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারের। তিনি কেনো সর্তকভাবে আমাদের মনিটরিং করলেন না। এই দায় থেকে তিনি এড়াতে পারেন না।
একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা কানে শুনছি, অমিত স্যার নাকি সোহাগকে বলেছেন তুমি ব্যবস্থা না করলে তোমার চাকরি যাবে। এই ঘটনায় তোমার দায় ছিল। আর তদন্ত কমিটিকে খুশি করতে হলে টাকা লাগবে। আমি কি বিনা পয়সায় তোমাকে বাঁচাতে পারব? এই কথা শুনে পুরো ডিভিশনে চাপা ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। কর্মীরা বলছেন, এটা আর যাই হোক, মানুষের মৃত্যুর ওপর ব্যবসা করা ছাড়া আর কিছু নয়।
আরেকজন প্রকৌশলী জানান, দরকষাকষির সময় নাকি বলা হয়েছিল মৃতের পরিবার ৭ লাখ পেলেই খুশি থাকবে, আর বাকি টাকা ম্যানেজমেন্টের জন্য। তদন্ত কমিটির সদস্যদের হাতে কিছু যাবে, বাকিটা আমাদের ভাগ হবে। এভাবেই নাকি চলে এখানে।
বিজ্ঞাপন
ডিপিডিসির সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশন দুর্নীতির কারখানা বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিপিডিসির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত অধিকারী এবং সহকারী প্রকৌশলী মো. রাহুলকে নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠে আসছে। প্রকৌশলী মহলে তাঁরা ‘অমিত-রাহুল সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। বলা হয়, ট্রান্সফারমার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সংযোগ, লাইন মেরামত সবকিছুতে টাকার বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
ডিপিডিসির এক প্রধান প্রকৌশলী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের অমিত-রাহুল সিন্ডিকেটের কীর্তিকলাপ আমরা প্রতিনিয়ত শুনছি। কিন্তু কিছু হয় না। তাঁদের পেছনে এত শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক আছে যে, যত অভিযোগই উঠুক না কেন, তাঁরা নিরাপদ। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশছে। কিন্তু কার স্বার্থে এই দুর্নীতিপরায়ণ দুই প্রকৌশলীকে সিদ্ধিরগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে রাখা হচ্ছে- এই প্রশ্ন এখন প্রকৌশলী সমাজের সবার মুখে মুখে।
আরও পড়ুন: শওকতের পকেটে দুর্নীতির বরকত
বিজ্ঞাপন
সূত্র জানায়, অমিত অধিকারী এবং রাহুলের সঙ্গে ডিপিডিসি প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মোরশেদ আলম খান অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের জোরেই তাঁরা বারবার অভিযোগের মুখে পড়েও বেঁচে যাচ্ছেন।
একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, ডিপিডিসির ভেতরে একটা শক্তিশালী চক্র কাজ করছে। এই চক্রের ছত্রছায়ায় অমিত-রাহুল যা খুশি তাই করতে পারছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তার চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দুর্ঘটনার পর থেকে প্রভাবশালীরা তাঁদের বাঁচাতে মাঠে নেমেছে। সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশন সূত্রের দাবি, গত বুধবার রাতে গভীর রাত পর্যন্ত ডিভিশন কার্যালয়ে একের পর এক বৈঠক চলেছে। বিভিন্ন স্তরের মানুষ এসেছেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল তদন্ত কীভাবে ‘ম্যানেজ’ করা যায়, কাকে কত টাকা দিতে হবে, কীভাবে অমিত-রাহুলকে বাঁচানো যায়।
ডিপিডিসির একজন কর্মী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে বৈঠক শেষে অমিত স্যার খুব খুশি মনে বেরিয়ে এসেছিলেন। মনে হচ্ছিল সব ঠিক হয়ে গেছে। তিনি নাকি বলেছেন তদন্ত যত কমিটিই হোক, শেষ পর্যন্ত সব ম্যানেজ হবে। চিন্তার কিছু নেই।
বিজ্ঞাপন
এদিকে, দুর্ঘটনা ঘটেছে গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। কিন্তু ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলামকে জানানো হয়েছে বিকেল সাড়ে ৩টার পর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর। এই দীর্ঘ সময়ে ডিভিশনের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা কী করছিলেন? কেন তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি? এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার তাঁরা ঘটনাটি চেপে যেতে চেয়েছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রহমত আলী জানান, দুর্ঘটনা ঘটার পর আমরা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করেছিলাম। কিন্তু কেউ আসছিল না। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর কয়েকজন এলেন। কিন্তু তাঁরা তেমন কিছুই করলেন না। নিহতের লাশ নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। তারপর আর তাঁদের দেখা যায়নি।
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দুর্ঘটনা হওয়ার পর সবাই হৈচৈ করছিলাম। নিহতের সহকর্মীরা কাঁদছিলেন। কিন্তু অফিস থেকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা এমনভাবে ব্যবহার করছিলেন, যেন কিছুই হয়নি। একজন নাকি বলেছিলেন এসব হয়ে থাকে। বেশি হৈচৈ করার দরকার নেই।
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে কিউ এম শফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বলেন, দুর্ঘটনার চার ঘণ্টা পর আমাকে খবর দেওয়া হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী কেউই আমাকে তাৎক্ষণিক জানাননি। এটা চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অবশ্যই তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো শুধু চাকরি বিধিমালার লঙ্ঘন। নাকি পরিকল্পিতভাবে ঘটনা লুকানোর চেষ্টা? সবাই বলছেন, ফেসবুকে ভিডিও ভাইরাল না হলে হয়তো এই ঘটনাটি কখনোই প্রকাশ্যে আসত না। হয়তো একটি ছোটখাটো দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে যেত।
জানা গেছে, দুর্ঘটনার দিন বিকেলে ডিপিডিসি সাউথের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ কামাল হোসেন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। রাতে প্রধান কার্যালয় থেকে আরও একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
ডিপিডিসির এক নির্বাহী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, এই দায় অমিত অধিকারী ও সোহাগ, রাহুলের। তাদের অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত করা উচিত ছিল। তদন্তে কী বের হবে সেটা আলাদা বিষয়। কিন্তু তাঁরা যে নিয়ম ভেঙেছেন, সেটা তো স্পষ্ট। তাঁদের স্বপদে বহাল রেখে তদন্ত হলে তাঁরা সব ম্যানেজ করে ফেলবেন।
বিজ্ঞাপন
আরেকজন প্রকৌশলী বলেন, তদন্ত কমিটিতে কাদের রাখা হয়েছে, সেটাও দেখার বিষয়। এখানে যদি অমিত-রাহুলের ঘনিষ্ঠ কেউ থাকেন, তাহলে তদন্তের ফল আগে থেকেই বোঝা যায়। আমরা চাই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রকৃত দোষীরা যেন শাস্তি পায়।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ডিপিডিসিতে একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যার পেছনে প্রভাবশালী আছে, সে যতই অপরাধ করুক, তার কিছু হয় না। আর যার কেউ নেই, তার ওপর সব দায় চাপানো হয়। অমিত-সোহাগ-রাহুলের পেছনে শক্তিশালী মহল আছে এটা সবাই জানে। তাই তদন্তে কী বের হবে, সেটা নিয়ে আমরা আশাবাদী নই।
বিজ্ঞাপন
নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের অন্য বিদ্যুৎকর্মীরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁরা বলছেন, ন্যূনতম সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই তাঁদের বিপজ্জনক কাজে পাঠানো হয়। আর দুর্ঘটনা ঘটলে দায় চাপানো হয় তাঁদের ওপরই।
একজন লাইনম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা প্রতিদিন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। উচ্চ ভোল্টেজের লাইনে কাজ করার সময় সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। অনেক সময় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকে না। তিনি আরো বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার আমাদের লাইনম্যানদের বলেন যা আছে তা দিয়েই কাজ সারো। এখন নজরুলের এই অবস্থা। আগামীকাল আমাদেরও এমন হতে পারে। কিন্তু আমাদের পরিবার কে দেখবে?
আরেকজন কর্মী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সবচেয়ে বড় ভয় হলো দুর্ঘটনা ঘটলে আমাদের ওপরই দায় চাপানো হবে। এখন শুনছি, তদন্ত ম্যানেজ করতে ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। এই টাকা দেব কোথা থেকে? আমরা তো সাধারণ কর্মী। আমাদের কোনো দিন এত টাকা হাতে আসবে না। তাহলে কি আমাদের চাকরি চলে যাবে? পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, অমিত স্যার ও রাহুল স্যারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নেই। তাঁদের ক্ষমতা অনেক। যে কথা বলবে, তার চাকরি চলে যাবে, এটা সবাই জানে। তাই আমরা চুপ থাকি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে জ্বলছি।
একজন সিনিয়র লাইনম্যান বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় একজন বিদ্যুৎকর্মী মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা শুরু হয়েছে। সব সময় দেখেছি ডিপিডিসিতে একই ধরনের অবহেলায় মৃত্যু হচ্ছে বিদ্যুৎকর্মীর। কিন্তু এই ঘটনা দিয়ে কোনো শিক্ষা নেয়নি। কোনো দিন প্রকৌশলীর শিক্ষা হবে না। কারণ, যাঁরা দায়িত্বে আছেন, তাঁরা নিজেদের বাঁচাতেই ব্যস্ত।
ডিপিডিসির একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, অমিত-রাহুলকে বাঁচাতে একটি শক্তিশালী মহল সক্রিয়। প্রধান কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে তাঁদের প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাবের কারণেই বারবার অভিযোগ উঠলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ডিপিডিসিতে একটা প্রবাদ আছে অমিত-রাহুলের পেছনে এত বড় মাপের লোক আছে যে, তাঁদের কিছু হবে না। মানুষ মারা গেলেও তাঁরা বেঁচে যাবেন। আর আমরা সাধারণ মানুষরা যত বিবৃতিই দিবেন, শেষ পর্যন্ত সব চাপা পড়ে যায় সাধারন কর্মীদের ওপর।
সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পরদিন গভীর রাত পর্যন্ত ডিভিশন অফিসে নানা স্তরের মানুষের আসাযাওয়া ছিল। কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদেরও ফোন এসেছে। মূল উদ্দেশ্য ছিল অমিত- সোহাগ-রাহুলকে বাঁচানো এবং তদন্ত ম্যানেজ করা।
একজন সচেতন মহলের ব্যক্তি বলেন, এটা আর ডিপিডিসির ভেতরের বিষয় নেই। এখানে বাইরের প্রভাব কাজ করছে। ক্ষমতাবানদের জাল এত শক্তিশালী যে, সাধারণ মানুষের কান্না সেখানে পৌঁছায় না। নজরুল ইসলামের পরিবার হয়তো কিছু টাকা পাবে, আর তারপর সব ভুলে যেতে বলা হবে। কিন্তু আসল অপরাধীরা থেকে যাবে তাদের জায়গায় আরও শক্তিশালী হয়ে।
একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষণে রেখেছে এটা একটা সাধারণ বক্তব্য। কিন্তু বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি? তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে কী করা হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা পাচ্ছি না।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব বলেন, আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আমরা তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।
কিন্তু প্রকৌশলীরা বলছেন, তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া আর অভিযুক্তদের স্বপদে বহাল রাখা এ দুটো ভিন্ন বিষয়। চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে এটা তো স্পষ্ট। এই অপরাধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। এতে মনে হচ্ছে, মন্ত্রণালয়ও হয়তো চাপের মুখে আছে।
অমিত-রাহুল-সোহাগ সিন্ডিকেট’ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিপিডিসির ভেতরে যে প্রভাবশালী চক্র তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিতে হবে। মাঠপর্যায়ের বিদ্যুৎকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। আধুনিক সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারহানা মমতাজ জানান, দুর্ঘটনার বিষয়টি তাঁরা অবগত আছেন। ডিপিডিসির তদন্ত কমিটি কাজ করছে এবং পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো শুধু পর্যবেক্ষণে রাখলেই কি হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








