স্ত্রীর লিভারে মৃত্যুকে হারিয়ে নতুন জীবনে আলম নুরী

এক বছর আগেও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদ আলম নুরী। চিকিৎসকদের ভাষায়, লিভার প্রতিস্থাপন ছাড়া তাকে বাঁচানোর আর কোনো পথ ছিল না। সেই সংকটময় মুহূর্তে নিজের লিভারের একটি অংশ দান করে স্বামীর জীবন বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেন স্ত্রী খাদিজা খাতুন। দীর্ঘ চিকিৎসা, অসংখ্য বাধা আর কঠিন সংগ্রামের পর আজ নতুন জীবন নিয়ে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন এই দম্পতি।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর মিরপুরে গড়ে ওঠা আলম নুরী ও খাদিজা খাতুনের সংসারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে আলম নুরীর। একপর্যায়ে রক্তবমি শুরু হলে তাকে রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসার সময় বিপুল পরিমাণ রক্ত ও প্লাটিলেট দেওয়ার পর তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, তিনি হেপাটাইটিস-বি–জনিত লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। চিকিৎসকেরা জানান, তার সুস্থ হওয়ার একমাত্র উপায় লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট।
এক বছরের লড়াই শেষে সফল অস্ত্রোপচার
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল অর্থ, উপযুক্ত ডোনার এবং বিদেশে যাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা। প্রায় ছয় মাস অর্থ সংগ্রহ, ভিসা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতা কাটিয়ে ২০২৫ সালের মার্চে ভারতের দিল্লির একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করেন তারা।
বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষা ও বোর্ডের অনুমোদনের পর ৭ আগস্ট একই দিনে আলম নুরী ও খাদিজার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। চিকিৎসকেরা খাদিজার লিভারের ৬৪ শতাংশ অংশ সফলভাবে আলম নুরীর শরীরে প্রতিস্থাপন করেন। অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
চিকিৎসায় বিপুল ব্যয়
বিজ্ঞাপন
এই চিকিৎসা সম্পন্ন করতে শুধু লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্যই ২১ লাখ রুপি ব্যয় হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, ওষুধ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং পরবর্তী চিকিৎসা মিলিয়ে আরও প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ রুপি খরচ হয়েছে।
বর্তমানে অস্ত্রোপচারের প্রায় এক বছর পার হলেও আলম নুরীকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় মেনে ওষুধ সেবন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কঠোর জীবনযাপন অনুসরণ করতে হচ্ছে।
"আমি বেঁচে আছি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি"
বিজ্ঞাপন
নিজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আলম নুরী বলেন, নতুন জীবন ফিরে পাওয়া তার কাছে অলৌকিক অভিজ্ঞতার মতো। তিনি জানান, এখন প্রতিটি দিনই নিয়ম মেনে কাটাতে হয়। নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস, মাস্ক ব্যবহার, সংক্রমণ থেকে দূরে থাকা এবং আজীবন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ গ্রহণ— সবই তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, অপারেশনের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে। প্রতি মাসে শুধু ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষার পেছনেই প্রায় ৩৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এখনো কর্মজীবনে ফিরতে পারেননি। নিজেদের সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর পর বর্তমানে পরিবার নিয়ে বান্দরবানের লামায় বসবাস করছেন।
স্ত্রীর ত্যাগের কথা ভুলতে পারেন না
বিজ্ঞাপন
আলম নুরীর ভাষায়, সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তার স্ত্রী খাদিজা। অস্ত্রোপচারের মাত্র কয়েক দিন পর নিজের শরীরে সেলাই নিয়েই আইসিইউতে গিয়ে স্বামীর জন্য রান্না করা খাবার পৌঁছে দিতেন তিনি। সেই দৃশ্য হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদেরও আবেগাপ্লুত করেছিল।

তিনি বলেন, খাদিজা শুধু তার জীবনই বাঁচাননি, ভালোবাসা, সাহস ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণও তৈরি করেছেন। তার কাছে স্ত্রী আজও "প্রাইড অব নেশন"।
খাদিজার লড়াইও ছিল কম কঠিন নয়
বিজ্ঞাপন
খাদিজা খাতুন জানান, শারীরিকভাবে তিনি বরাবরই দুর্বল ছিলেন। দুটি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পরও নিজের লিভারের অংশ স্বামীকে দিতে পিছপা হননি। তার ভাষায়, পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া এখন দুঃস্বপ্নের মতো মনে হলেও স্বামীকে সুস্থ দেখে সব কষ্ট ভুলে যেতে পারেন।
বর্তমানে তার শরীরেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। ভারী কাজ করতে পারেন না, বিশ্রামের প্রয়োজন হয় বেশি। তবু সংসারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তার অনুশোচনা নেই। ভালোবাসার মানুষকে বাঁচাতে পারাটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
বিজ্ঞাপন
অঙ্গদান নিয়ে সচেতনতার আহ্বান
খাদিজার মতে, দেশে লিভার প্রতিস্থাপন নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম এবং ভয় বেশি। বাংলাদেশেই যদি নিয়মিত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে চিকিৎসা ব্যয় অনেক কমে যাবে এবং বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনও কমবে।
তিনি বলেন, যাদের আর্থিক সক্ষমতা ও উপযুক্ত ডোনার রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলে সফলতার সম্ভাবনা বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসকের পরামর্শ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, হেপাটাইটিসের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিস এবং শেষ পর্যন্ত লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন এড়ানো সম্ভব।
তার মতে, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফল হলে রোগীরা দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন। তবে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং সংক্রমণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের সুযোগ এখনো সীমিত। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতায় দেশে আধুনিক লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব, যা হাজারো রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি পরিবারের এই সংগ্রামের গল্প শুধু ভালোবাসার নয়, বরং অঙ্গদান, আধুনিক চিকিৎসা এবং অদম্য মানসিক শক্তিরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা আলম নুরী ও তার স্ত্রী খাদিজা খাতুন এখন অন্য রোগীদের জন্যও আশা, সাহস এবং সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান।








