পরিচালক ইউসুফের ইশারায় চলছে মুদ্রণ অধিদপ্তর

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতায় মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরূত্বপূর্ন কেপিআই প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে পরিচালক (যুগ্মসচিব) মুহাম্মদ ইউসুফ একজন চতুর এবং মহা দূর্ণীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর এর সহযোগী হিসেবে রয়েছেন দপ্তরটির উপপরিচালক (যুগ্মসচিব) ব্রেনজন চাম্বুগং।
বিজ্ঞাপন
তিনি একই দপ্তরে চাকরি করেন প্রায় ৮ বছরের অধিক সময় ধরে। বদলি আদেশের তোয়াক্কা না করে একই চেয়ারে রয়েছেন বহাল তবিয়তে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা হওয়া অভিযোগ পত্র থেকে এ তথ্য জানা যায়।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড ব্যাংকের দায়বদ্ধতার কারণে বিভিন্ন টেন্ডারে অংশ নিতে পারছে না। এর ফলে তারা চতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করে কোন ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই নতুন প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা ফাইন পেপার নামে দরপত্রে অংশ নেয়। কিন্তু পিপিআর মোতাবেক সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং অন্য কোন দরপত্র রেসপন্সিভ না পাওয়ায় দরপত্রটি রি-টেন্ডার করে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ। প্রায় ৯ কোটি টাকার উপরে কারযাদেশ প্রদান করেন তিনি এ কাজেও তাকে পরিপূর্ণ সহায়তা করেছে ব্রেনজন চাম্বুগং। যদিও অভিযোগের বিষয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের আওতাধীন বাংলাদেশ স্টেশনারী অফিসের উপপরিচালক (যুগ্মসচিব) ব্রেনজন চাম্বুগংয়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে সিএন্ডএফ এজেন্ট নিয়োগের বিষয়ে দরপত্র আহ্বানের পর পরিচালক মুহাম্মদ ইউনুফের পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান রেসপ্লসিভ না হওয়ায় কোন কারণ ছাড়াই পূর্ণ দরপত্র আহ্বান করেন। এরপর পিপিআরের নিয়মকে বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখিয়ে কোন ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এবং কোন যাচাই বাছাই ছাড়াই কয়েক মিনিটে মূল্যায়ন সম্পন্ন করে তাশমি এন্টারপ্রাইজকে এজেন্ট নিয়োগের কাজ দেওয়ার বিষয়টি অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, পরিচালক মুহাম্মদ ইউনুফের মদদে জিকে ট্রেড, টিআর এন্টারপ্রাইজ, তাসমি এন্টারপ্রাইজসহ আরও কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পয়দা হয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের কাগজ পত্রে যোগ্যতার বিরাট ঘাটতি থাকলেও ঘুষের বিনিময়ে পরিচালক কোন প্রকার ডকুমেন্টস যাচাই না করেই উৎকোচের বিনিময়ে বিভিন্ন কার্য্যাদেশ দিয়ে থাকেন। সিন্ডিকেট ভাঙ্গার নামে চতুরতার সাথে নিজস্ব সিন্ডিকেট পয়দা করেছেন। যার ফলে এই সিন্ডিকেট এ পর্যন্ত ডায়েরি, কলম, ডাস্টার, কাপড়, পেলেট সরবরাহসহ কয়েক কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। মুহাম্মদ ইউসুফ ঠিকাদারদেরকে জিম্মি করে খেয়াল খুশি মত পরিচালনা করছে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর। এছাড়াও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারী ডায়েরী ক্রয়ের সময় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নমুনা পরিচালক মুহাম্মদ ইউনুফ নিজের কাছে কুক্ষিগত রেখে শুধুমাত্র নিজস্ব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিকে ট্রেডকে দেখাতেন। ফলে বাজার দরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন দামে নিম্নমানের ডায়েরী সরবরাহ করে জিকে ট্রেডের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বালাম বই ছাপানোর জন্য আইজিআর এজুরলেড কাগজের যে চাহিদা দিয়েছিল। সেই চাহিদা থেকে অতিরিক্ত কাগজ বেশি দামে ক্রয়ের জন্য বেনজন জাম্বুগংয়ের যোগসাজশে দরপত্র আহ্বান করেন তিনি। ফলে প্রায় ১৩ কোটি টাকার দরপত্রটি পেয়ে যায় বসুন্ধরা ফাইন পেপার। চলতি বছরের শুরুতে একই কাগজের রিম ৬ হাজার ৮০০ টাকায় নূরজাহান এন্টারপ্রাইজ নামক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে সরবরাহ নেয় মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের মূল্য বৃদ্ধি না পেলেও একই কাগজ প্রায় ২.৫ কোটি টাকা বেশ দর দিয়ে বসুন্ধরা ফাইন পেপারের নিকট থেকে প্রায় ১৬ হাজার রিম কাগজ ক্রয় করা হয়েছে।
কার্টিজ কাগজ ক্রয় করার আগে পরিচালক ইউসুফ গ্রাফিকস এসোসিয়েটস কোম্পানির মালিক মাহফুজুর রহমান বাবুলের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে ১.৫ কোটি টাকার ঘুষের বিনিময়ে ১৮ কোটি টাকার কার্টিজের টেন্ডার দেওয়ার চুক্তি করেন। উপ পরিচালক ব্রেনজন চাম্বুগংয়ের সাথে মিলে টেন্ডারে বিভিন্ন কন্ডিশন ম্যানিপুলেট করে সংশোধনীর মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ ইউসুফ দৈনিক জনবাণী কে বলেন, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদেশ্য প্রনোদিত ভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে। যার কোন সত্যতা নেই।
বিজ্ঞাপন
জানা যায়, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের আওতাধীন বাংলাদেশ স্টেশনারী অফিসের ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে দলিলের রেকর্ড লেখায় ব্যবহৃত কাগজ ক্রয়ের মাধ্যমে শুধু একটি পণ্য ক্রয়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। ওই অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদার পরস্পর যোগসাজশে সরকারি এই অর্থ লোপাট করেছেন। সম্প্রতি দেশি প্রতিষ্ঠানের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মজুত মালামাল পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই শেষে দাখিল করা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। তিনি ২০২২ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক (উপসচিব) থাকাকালীন সময়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের উপর তত্কালীন সময়ে নিজের ফেসবুক ও গণমাধ্যমের মন্তব্য কলামে ছিলেন সরব। তিনি সে সময় ড. মুহাম্মদ ইউনুসের তিরস্কার ও শেখ হাসিনার প্রশংসা করে লেখেন, "সংসদে দাঁড়িয়ে শেখের বেটি ঘোষণা করলেন, পদ্মা সেতু হবে, আমাদের অর্থেই হবে।' সেদিন আমিও শিহরিত হয়েছিলাম, অশ্রুসিক্ত হয়েছিলাম।" সে সময় তিনি নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস সম্পর্কে আরও লেখেছিলেন, "ক্লিনটন লবির মাধ্যমে মধ্যস্থতার অস্ত্র হিসেবে বেছে নিলেন পদ্মা সেতু প্রকল্পকে। হয় গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ ফিরিয়ে দাও, না হয় পদ্মা সেতুর কথা ভুলে যাও। শুরু হলো মিথ্যা গল্প বানিয়ে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার বাহানা। আপনি জানতেন, সরকার গতানুগতিক হলেও শেখের বেটির রক্তে শেখের মতোই দেশপ্রেম রয়েছে। তিনি এই এমডি পদের জন্য এত অত্যাবশ্যকীয় মেগা প্রজেক্ট খোয়াবেন না" যদিও ২০১৪ সালে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পাওয়ার পর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেন তিনি।
অভিযোগটি আমলে নিয়ে গত ২১ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-২ মো. আশরাফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে দেখা যায়, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ ইউনুফ ও উপপরিচালক যুগ্মসচিব) ব্রেনজন চাম্বুগংয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে নির্দেশ প্রদান করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুন মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে মুহাম্মদ ইউনুফ ও ব্রেনজন চাম্বুগংয়ের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক দৈনিক জনবাণী কে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী পরিচালকের বিরুদ্ধে তার অধিনস্থ কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করানো যায় না। অপরদিকে অভিযোগকারীর কোন পরিচয় না পাওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে তবে চলতি সপ্তাহে তদন্ত কমিটি গঠন হবে।
বিজ্ঞাপন








