কেমিক্যালের আড়ালে অনলাইনেই বিক্রি হচ্ছে মাদক!

নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের অনলাইন বিক্রির অভিযোগে অভিযান চালিয়ে মোট সাড়ে ৬ লিটার রাসায়নিক জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। সংস্থাটির দাবি, এসব রাসায়নিকের কিছু হেরোইন, এলএসডি, কোকেনসহ বিভিন্ন মাদক তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। এ ঘটনায় অনলাইনে রাসায়নিক বিক্রির প্রতিষ্ঠান ই-কেমের এক ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, সাইবার পেট্রোলিংয়ের সময় ই-কেম নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, অ্যাসিটোন, সালফিউরিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক বিক্রির তথ্য নজরে আসে। বিষয়টি যাচাই করতে কর্মকর্তারা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় একটি নিয়ন্ত্রিত অনলাইন ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এর অংশ হিসেবে ৫০০ মিলিলিটার অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইডের অর্ডার দেওয়া হয় এবং এর মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করা হয়। ২৪ আগস্ট সন্ধ্যায় গুলশানের নিকেতন এলাকায় পণ্য সরবরাহের সময় ই-কেমের প্রতিনিধি মো. মঞ্জুরুল ইসলামকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে দুটি পার্সেল জব্দ করা হয়। একটি পার্সেলে ছিল অর্ডার করা অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড। অন্যটিতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও এক লিটার অ্যাসিটোন পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরে মঞ্জুরুল ইসলামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই রাতে কুড়িলের প্রগতি সরণিতে ই-কেমের কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে আটক করা হয়। তল্লাশিতে ৫০০ মিলিলিটার সালফিউরিক অ্যাসিড ও ৫০০ গ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটসহ কম্পিউটার, মনিটর, মোবাইল ফোন এবং প্রতিষ্ঠানের ই-ট্রেড লাইসেন্স জব্দ করা হয়।
ডিএনসি জানিয়েছে, সব মিলিয়ে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড, অ্যাসিটোন, সালফিউরিক অ্যাসিড ও পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটসহ প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মিলিলিটার নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক জব্দ করা হয়েছে। এসব রাসায়নিক সংরক্ষণ ও বিক্রির বৈধ কাগজপত্র দেখাতে বলা হলেও প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার তা দেখাতে পারেননি।
বিজ্ঞাপন
ডিএনসির রাসায়নিক পরীক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড হেরোইন তৈরিতে কাজে লাগে। এটা ছাড়া হেরোইন হবে না। ৫০০ গ্রাম অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড দিয়ে ৮৯০ গ্রাম হেরোইন বানানো সম্ভব। আর অ্যাসিটোন দিয়ে কোকেন, এলএসডি ও কিটামিনের মতো ভয়ংকর মাদক বানানো হয়। অ্যাসিটোন ছাড়া এসব মাদক বানানো সম্ভব নয়। আর সালফিউরিক অ্যাসিড ও পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দিয়ে কোকেন, ইয়াবা ও হেরোইন বানানো হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাড়ে ৬ কেজি কেমিক্যাল দিয়ে ১০ থেকে ১২ কেজি মাদক বানানো সম্ভব।’
ডিএনসি সূত্রের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তি জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রায় ৩০টি রাসায়নিকের চালান তারা ইতোমধ্যে সরবরাহ করেছেন। ওইসব রাসায়নিক কারা নিয়েছেন এবং সেগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
বিজ্ঞাপন
ডিএনসির উপপরিচালক (গোয়েন্দা-ঢাকা) মো. মেহেদি হাসান বলেন, ‘আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে, ই-কেম নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে বিক্রি করা হচ্ছে, যার মধ্যে এমন কিছু কেমিক্যালও রয়েছে, যা মাদকদ্রব্য প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।’
তিনি জানান, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স সাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মাদক বা মাদক তৈরির উপকরণ অবৈধভাবে বিক্রি ও সরবরাহের বিরুদ্ধে সাইবার পেট্রোলিং এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশোধিত বিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএনসি।
বিজ্ঞাপন
দারাজেও টিএইচসি বিক্রির অভিযোগ
অন্যদিকে, জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজে ‘সিবিডি তেল’ নামে টিএইচসি বিক্রির অভিযোগে মোহাম্মদ আনিসুর রহমান নামে এক কেমিস্টকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএনসি। সংস্থাটির দাবি, ক্রেতা সেজে নমুনা সংগ্রহ ও রাসায়নিক পরীক্ষার পর ওই তরলে টিএইচসির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
ডিএনসি সূত্র জানায়, কর্মকর্তারা তিন বোতলে মোট ৬০ মিলিলিটার তরল পদার্থের অর্ডার দেন। ১৬ আগস্ট সেগুনবাগিচায় পণ্য সরবরাহ করতে এলে দারাজের ডেলিভারিম্যান মো. নাঈমকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাড্ডার সাঁতারকূলে অভিযান চালিয়ে আনিসুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
অভিযানে তার কাছ থেকে ৬২০ মিলিলিটার টিএইচসি, মাদক প্রস্তুত ও প্যাকেটজাত করার সরঞ্জাম, ৫০টি কাচের বোতল, দারাজের লোগোযুক্ত প্যাকেট, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। জব্দ করা টিএইচসির আনুমানিক বাজারমূল্য ৬০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ডিএনসি।
বিজ্ঞাপন
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত পাঁচ বছরে দারাজের মাধ্যমে প্রায় ৪০৫ বোতল টিএইচসি বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় আনিসুর রহমানের পাশাপাশি দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইডসহ কয়েকটি রাসায়নিক খোলাবাজারে বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব রাসায়নিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে বৈধ কাগজপত্র না পাওয়ায় বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব রাসায়নিক অবৈধভাবে বাজারে আসার সম্ভাব্য উৎস খুঁজে দেখা হচ্ছে। বৈধ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থেকে অননুমোদিতভাবে সরবরাহ করা হয়েছে কি না, কিংবা আমদানির সময় মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল কি না—দুই দিকই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ডিএনসির মহাপরিচালক আরও বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদকের প্রচার, বিক্রি বা সরবরাহে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনলাইন অপরাধের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রমাণ মুছে ফেলা সহজ নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি।








