বাবার পত্রিকা বিক্রি, বড় ভাইয়ের ত্যাগ– অশোকের বলে গতির ঝড়

বাড়ির সামনের বারান্দার মতো ছোট্ট জায়গায় দুই ভাইয়ের অনুশীলন দিয়ে শুরু হয়েছিল তাদের ক্রিকেট যাত্রা। আর্থিক সংকটের কারণে বড় ভাই অক্ষয় শর্মা বেশিদিন খেলতে পারেননি। বাবা নথুনাল শর্মা দিনে চাষাবাদ আর রাতে পত্রিকা বিতরণ করে সংসার চালাতেন। ফলে অক্ষয় নিজের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে ছোট ভাই অশোককে এগিয়ে দেন। সেই সংগ্রামের পথ পেরিয়ে এখন আইপিএলে গুজরাট টাইটান্সের হয়ে ১৫৪.২ কিলোমিটার বেগে বল ছুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন অশোক শর্মা।
বিজ্ঞাপন
শৈশবে অশোক বড় ভাই অক্ষয়কে লক্ষ্য করে বল করতেন। উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটাই—তাকে আঘাত করা। আর সেটা সম্ভব ছিল দ্রুতগতির বল দিয়েই। অক্ষয় বলেন, “আমি তাকে দ্রুত বল করে আঘাত করতাম। প্রতিশোধ নিতে সেও দ্রুত বল করা শুরু করে। তখন ভাবিনি সে এতটা ভালো হয়ে উঠবে।” তার মতে, স্কুল ক্রিকেটে অশোকের গতিময় বল এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরা আউট হওয়ার ভয়ে নয়, বরং বলের ভয়ে স্টাম্প ছেড়ে দূরে সরে যেত। অনেকের পাঁজর ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, এই গতি তোলার পেছনে কোনো কোচের বড় ভূমিকা ছিল না। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুশীলন ও চেষ্টার ফল। বাড়ির করিডোরে বড় ভাইকে লক্ষ্য করে ছোট ভাইয়ের আঘাতের চেষ্টা ধীরে ধীরে তাকে মাঠে নিয়ে গেছে। স্কুল ক্রিকেটের পর আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে গুজরাট টাইটান্সের হয়ে ১৫৪.২ কিলোমিটার গতির বল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অশোক।
বিজ্ঞাপন
তার এতদূর আসার নেপথ্য সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, রামপুরা থেকে জয়পুর প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। অশোকের বাবা নথুনাল শর্মা দিনে চাষাবাদ করতেন এবং পত্রিকা বিতরণের কাজ করতেন রাতে। মাসে তার আয় ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। ফলে পরিবার চেয়েছিল ছেলেরা পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি করুক। কিন্তু দুই ভাই–ই ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিল। আর্থিক সীমাবদ্ধতায় একজনকেই সুযোগ দেওয়া সম্ভব ছিল। বড় ভাই অক্ষয় নিজের স্বপ্ন ত্যাগ করে ছোট ভাইকে এগিয়ে দেন। অশোককে ভর্তি করানো হয় জয়পুরের আরাবালি ক্রিকেট একাডেমিতে, যার পরিচালক ছিলেন সাবেক ক্রিকেটার বিবেক যাদব।
বিবেক যাদবের একাডেমি আগেও আলোচনায় এসেছে কয়েকজন ক্রিকেটার আইপিএলে সুযোগ পাওয়ার কারণে। করোনা মহামারির সময় বিবেকের মৃত্যু অশোকের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। সেই কঠিন সময়ে দুই ভাই অক্ষয়-অশোক পরিবারের খামারে কাজ করতে নামেন। পাশাপাশি অক্ষয় ক্রিকেট কোচিং চালিয়ে যান। অশোক ২০১৯ সালে রাজস্থান অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পান, কিন্তু করোনায় খেলা বন্ধ হয়ে যায়। পরে হোস্টেলে থেকে অনুশীলন চালিয়ে যান।
অশোক ২০২২ সালে প্রথম কলকাতা নাইট রাইডার্সের ডাকে আইপিএলে সুযোগ পান, যদিও ম্যাচ খেলা হয়নি তার। তখন পুরো গ্রামে তাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, পরে রাজস্থান রয়্যালসে নাম লেখালেও তার ভাগ্য বদলায়নি। ওই ফ্র্যাঞ্চাইজিতেও খেলার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন অশোক। এবার গুজরাটের হয়ে খেলতে নেমে গতির ঝড় তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের।
বিজ্ঞাপন
আইপিএলে অবশ্য অশোকের চেয়েও বেশি গতি তোলার নজির আছে। সে হিসেবে উমরান মালিক, মায়াঙ্ক যাদবদের উত্তরসূরী বলা যায় তাকে। ২৩ বছর বয়সী এই পেসার গুজরাট কোচ আশিষ নেহরার অধীনে আরও উন্নতি করবেন বলে প্রত্যাশা বড় ভাইয়ের। অশোককে জাতীয় দলে খেলতে দেখার ইচ্ছা জানিয়ে অক্ষয় বলেন, ‘সে যেন কম্পিউটারের মতো, যেখানে বল করতে বলবে, সেখানেই বারবার করতে পারবে। এখন সবাই তার কথা বলছে। কিন্তু লক্ষ্য অনেক দূরে, ভারতীয় দলের নীল জার্সি পেতে হলে তাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’
অক্ষয়-অশোকের বাবাকে এখন আর কাজ করতে হয় না। ছেলেরা আর করিডরে না খেলায় সমালোচনা শুনতে হয় গ্রামের মানুষের কাছ থেকে। সর্বশেষ সৈয়দ মুসতাক আলি ট্রফিতে ৭ ম্যাচে ১৯ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি বোলার হয়েছিলেন অশোক। গুজরাট তাকে দলে নিয়েছিল ৯০ লাখ রুপিতে। যদিও এখনও হয়তো বলার মতো কিছু করতে পারেননি, তবে পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে ম্যাচে বোলিং দেখে অশোককে ‘খুবই মূল্যবান’ বলে মন্তব্য করেন গুজরাট অধিনায়ক শুভমান গিল।
বিজ্ঞাপন








