‘ব্যাটল অব বার্ন’: ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার দিন

১৯৫৪ সালের ২৭ জুন—ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন একটি দিন, যা আজও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের ওয়াঙ্কডোর্ফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হাঙ্গেরি ও ব্রাজিলের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি পরে পরিচিতি পায় ‘ব্যাটল অব বার্ন’ নামে। মাঠের ভেতর ও বাইরে ঘটে যাওয়া মারামারি, ধাক্কাধাক্কি ও তীব্র উত্তেজনার কারণে ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ঘটনায় পরিণত হয়।
বিজ্ঞাপন
তৎকালীন সময়ে হাঙ্গেরি দল ছিল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর একটি। ফেরেঙ্ক পুসকাসের নেতৃত্বে গড়া ‘গোল্ডেন টিম’কে প্রায় অপরাজেয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অন্যদিকে, ১৯৫০ সালের মারাকানাজো পরাজয়ের ক্ষতি ভুলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামে ব্রাজিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই গতি ছিল তীব্র। মাত্র সাত মিনিটের মধ্যেই হাঙ্গেরি ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। এরপরই ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। একের পর এক সহিংস ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি ও তর্কাতর্কিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইংলিশ রেফারি আর্থার এলিসও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। ম্যাচে মোট ৪২টি ফ্রি-কিক ও ২টি পেনাল্টি দেওয়া হয়, আর তিনজন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হয়। ব্রাজিলের নিল্টন সান্তোস ও উমবার্তো তোজ্জি এবং হাঙ্গেরির জোসেফ বোজসিক লাল কার্ড পান।
বিজ্ঞাপন
ব্রাজিল একটি গোল শোধ দিলেও হাঙ্গেরি দ্রুতই আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে জয় লাভ করে। তবে ম্যাচের ফলাফলের চেয়ে আলোচনায় বেশি উঠে আসে শেষ বাঁশির পরের সহিংসতা।
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার টানেলে দুই দলের খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। বোতল নিক্ষেপসহ মারামারিতে হাঙ্গেরির ম্যানেজার গুস্তাভ সেবেস আহত হন এবং তার মুখে চারটি সেলাই দিতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড ফেরেঙ্ক পুসকাসও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন এবং বোতল নিক্ষেপ করেন। অন্যদিকে, ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা ড্রেসিংরুমের আলো ভেঙে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন বলেও জানা যায়।
বিজ্ঞাপন
পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে সুইস পুলিশকে হস্তক্ষেপ করে দুই দলকে আলাদা করতে হয়। পরে ব্রিটিশ গণমাধ্যম এই ম্যাচকে ‘ব্যাটল অব বার্ন’ নামে অভিহিত করে, যা আজও ফুটবল ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস ম্যাচগুলোর একটি।
রেফারি আর্থার এলিস পরে বলেছিলেন, “আমি ভেবেছিলাম এটি আমার দেখা সেরা ম্যাচগুলোর একটি হবে, কিন্তু তারা পশুর মতো আচরণ করেছিল। এটি ফুটবল ইতিহাসের জন্য একটি লজ্জাজনক ঘটনা।”
এই ঘটনার পর ব্রাজিল ফুটবল দলে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে পুনর্গঠনের ফলেই দলটি নতুন করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ১৯৫৮ বিশ্বকাপে পেলে-সমৃদ্ধ দলটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।








