আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন

দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে বসল স্পেন। নিউইয়র্ক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে লা রোজা।
বিজ্ঞাপন
ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে। ১০৬তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের দারুণ অ্যাসিস্ট থেকে গোল করে স্পেনকে কাঙ্ক্ষিত জয় এনে দেন বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণে আধিপত্য দেখায় স্পেন। পঞ্চম মিনিটেই লামিন ইয়ামাল দলকে এগিয়ে দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেন। তার ক্রস ডিফ্লেক্ট হয়ে দানি ওলমোর কাছে যায়। ওলমো ফের বল ফিরিয়ে দিলে ইয়ামাল শট নিলেও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা।
ফাইনালের শুরু থেকেই দুই দল পাল্টাপাল্টি আক্রমণে জমিয়ে তোলে ম্যাচ। এক পর্যায়ে মিকেল ওয়ারজাবালের ফ্লিক থেকে পেদ্রো পোরো এগোতে গেলে তাকে ফাউল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। তবে রেফারি স্লাভকো ভিনসিক খেলাটি চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
স্পেন শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও আর্জেন্টিনাও সুযোগ তৈরির চেষ্টা করে। সপ্তম মিনিটে লিওনেল মেসির সম্ভাব্য গোলের সুযোগ দ্রুত লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে নষ্ট করে দেন উনাই সিমন।
প্রথম ২৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার বল দখলের হার ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। এ সময় লিওনেল মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ—এই তিন ফরোয়ার্ড মিলে মাত্র ১৭ বার বল স্পর্শ করেন।
বিজ্ঞাপন
স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি মিডফিল্ডের পাশাপাশি রক্ষণভাগেও অসাধারণ ভূমিকা রাখেন। বলের নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং প্রতিপক্ষের অর্ধে চাপ তৈরিতে তিনি ছিলেন অনন্য। ফলে স্পেনের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে বেশ চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা।
৩৯তম মিনিটে লাপোর্তে, রদ্রি ও বায়েনার দারুণ সমন্বয়ের পর ফাবিয়ান রুইজ বল বাড়ান ওয়ারজাবালের কাছে। বক্সের বাইরে থেকে তার জোরালো বাঁ-পায়ের শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
৪১তম মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। দুই মিনিট পর ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়েন তিনি, তার বদলে নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি। একই সময়ে কুকুরেয়ার একটি প্রচেষ্টা অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়।
বিজ্ঞাপন
প্রথমার্ধ শেষে বলের দখলে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। তাদের দখলে ছিল ৬৫ শতাংশ বল, আর্জেন্টিনার ছিল ৩৫ শতাংশ। স্পেন লক্ষ্যে দুটি শট নেয় এবং সফল পাস সম্পন্ন করে ৩১৩টি। বিপরীতে আর্জেন্টিনার সফল পাস ছিল ১৫৫টি। সবচেয়ে হতাশার বিষয়, প্রথমার্ধে লক্ষ্যে তো দূরের কথা, কোনো শটই নিতে পারেনি বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। উনাই সিমনের দুটি দ্রুত সুইপও তাদের আক্রমণ ভেস্তে দেয়। স্পেন ফাইনাল থার্ডে প্রবেশ করে ৩৫ বার, যেখানে আর্জেন্টিনা যায় মাত্র ১৮ বার।
বিরতির পর আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি পরিবর্তন আনেন। প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়া নিকো গঞ্জালেজের পরিবর্তে মাঠে নামেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ওয়ারজাবালের পাস থেকে সুযোগ পান বায়েনা। তবে তার দুর্বল শট সহজেই ধরে ফেলেন মার্টিনেজ।
বিজ্ঞাপন
মাঠে নেমেই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন পারেদেস। এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে রেফারিকে ঘিরে ধরেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। সেই উত্তেজনার মধ্যেই মাটিতে পড়ে যান দানি ওলমো।
৫৫তম মিনিটে ওতামেন্দির সময়োপযোগী ট্যাকলে নিশ্চিত বিপদ থেকে রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা। এরপরও একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে স্পেন। ওলমোর ব্যাকপাস থেকে কুকুরেয়ার সামনে বল পৌঁছানোর আগেই গঞ্জালো মন্তিয়েল বিপদমুক্ত করেন। কিছুক্ষণ পর স্কালোনি তার জায়গায় নাহুয়েল মলিনাকে নামান।
৬২তম মিনিটে স্পেনের হয়ে মাঠে নামেন পেদ্রি ও ফেরান তোরেস। এরপরও আক্রমণের ধার বজায় রাখে ইউরোপিয়ান দলটি। ওলমোর দূরপাল্লার শট, ইয়ামালের ক্রস থেকে তোরেসের হেড—সবকিছুই ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
বিজ্ঞাপন
১৯৬৬ সালে পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ৭০ মিনিটে লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এর আগে সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার রেকর্ড ছিল গত আসরের ফ্রান্সের, যারা ৬৮ মিনিট পর্যন্ত লক্ষ্যে শট নিতে পারেনি।
৭০তম মিনিটে রদ্রিগো ডি পল ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে তুলে জিউলিয়ানো সিমিওনে এবং ফাকুন্দো মেদিনাকে মাঠে নামান স্কালোনি। ৭৫তম মিনিটে স্পেনও দানি ওলমো ও বায়েনার পরিবর্তে মিকেল মেরিনো ও নিকো উইলিয়ামসকে নামায়।
পরবর্তী সময়ে পেদ্রি, ইয়ামাল, কুবার্সি ও লাপোর্তের একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন মার্টিনেজ। ৮৭তম মিনিটে তোরেসের শটও অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
বিজ্ঞাপন
ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে উইলিয়ামসের জোরালো শটও রুখে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। এরপর কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। শেষ মুহূর্তে ইয়ামালের নেওয়া ফ্রি-কিকও দারুণভাবে প্রতিহত করেন মার্টিনেজ।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ভাগে একবার জালেও বল জড়ায় স্পেন। ৯৬তম মিনিটে মিকেল মেরিনোর শট এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বলে গোল করেন নিকো উইলিয়ামস। তবে মেরিনো ওতামেন্দিকে ফাউল করেছিলেন বলে রেফারি গোল বাতিল করেন। পরে ভিএআরেও সেই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
তবে হতাশ হতে হয়নি স্পেনকে। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামস বল বাড়িয়ে দেন ফেরান তোরেসের সামনে। সহজ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জালে বল পাঠিয়ে স্পেনকে এগিয়ে দেন এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে পঞ্চম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোলের কীর্তিও গড়েন তিনি।
বিজ্ঞাপন
এই জয়ে ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নিল স্পেন। অন্যদিকে ২০১৪ সালের পর আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ পেল আর্জেন্টিনা।








