শেষ হলো এক মহাকাব্য, রয়ে গেল শুধুই স্মৃতি

সময় কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। একদিন যে হাততালিতে মুখর ছিল স্টেডিয়াম, একদিন সেই গ্যালারিই নীরব হয়ে যায়। যে পা একসময় লাখো দর্শকের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিত, একসময় সেই পদচারণাও থেমে যায়। ফুটবলেরও এমনই এক সন্ধিক্ষণ এসে দাঁড়িয়েছে। মনে পড়িয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পঙ্ক্তি— ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, বাইবো না আর খেয়া নৌকা এই ঘাটে।’
বিজ্ঞাপন
২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু নতুন এক চ্যাম্পিয়নের জন্ম দেয়নি, হয়তো বিদায়ের ঘণ্টাও বাজিয়ে দিয়েছে এক সোনালি যুগের। প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের আলো হয়ে থাকা লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদ্রিচ এবং সম্ভবত নেইমার জুনিয়রের মতো কিংবদন্তিদের বিশ্বকাপ অধ্যায় এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারে। কোটি কোটি সমর্থকের কাছে এটি শুধু একটি টুর্নামেন্টের সমাপ্তি নয়, বরং এক আবেগময় যুগের শেষ অধ্যায়।

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম লেখা থাকবে অনন্য উচ্চতায়। ৪১ বছর বয়সে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার বিরল কীর্তি গড়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। বয়সের সঙ্গে লড়াই করে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ার পর আরও একটি বিশ্বকাপে তাকে দেখা যাবে—এমন সম্ভাবনা কার্যত নেই বললেই চলে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে লিওনেল মেসির গল্প যেন এক মহাকাব্য। ২০১৪ সালের ফাইনালের আক্ষেপ পেছনে ফেলে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ এনে দেন তিনি। এবারও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা ছুঁতে পারেননি। ৩৯ বছর বয়সী মেসি এখনও ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত কিছু জানাননি। তবে বাস্তবতা বলছে, স্পেনের বিপক্ষে খেলা এই ফাইনালই হয়তো বিশ্বকাপ মঞ্চে তার শেষ উপস্থিতি হয়ে থাকবে।
বিজ্ঞাপন

ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র লুকা মদ্রিচও পৌঁছে গেছেন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। ৪০ বছর বয়সেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন নিজের দেশকে। অভিজ্ঞতা, মেধা আর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণে বহু বছর বিশ্ব ফুটবলকে মুগ্ধ করা এই কিংবদন্তির বিশ্বকাপ যাত্রাও সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে সদ্য সমাপ্ত আসরেই।
নেইমার জুনিয়রের গল্পটা কিছুটা ভিন্ন। বয়স মাত্র ৩৪ হলেও একের পর এক গুরুতর চোট তার ক্যারিয়ারকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে তার খেলার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত ছিল। শেষ পর্যন্ত কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার ওপর আস্থা রাখেন। যদিও আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দেননি নেইমার, বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন নিজের কথাতেই। নরওয়ের বিপক্ষে বিদায়ের পর তিনি বলেছিলেন, ‘এখানেই শুরু, এখানেই শেষ।’ সেই একটি বাক্যই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
শুধু এই চার তারকাই নন, বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে পারেন আরও অনেক পরিচিত মুখ। ২০১৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির অধিনায়ক এবং আধুনিক ফুটবলে ‘সুইপার-কিপার’ ধারণার অন্যতম পথিকৃৎ ম্যানুয়াল ন্যুয়ারের বিশ্বকাপ অধ্যায়ও শেষ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
একইভাবে আগামী বিশ্বকাপে হয়তো আর দেখা যাবে না বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনা, মিশরের মোহামেদ সালাহ, নেদারল্যান্ডসের ভার্জিল ফন ডাইক, দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিউং মিন এবং মেক্সিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গিলের্মো ওচোয়াকে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এই তালিকায় আরও রয়েছেন আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওটামেন্ডি, ব্রাজিলের কাসেমিরো, বসনিয়ার এডিন জেকো এবং স্কটল্যান্ডের ক্রেইগ গর্ডনের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলাররা। বয়স, সময় আর বাস্তবতার কাছে হার মেনে তাদের অনেকেরই হয়তো আর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরা হবে না।
ফুটবলের ইতিহাসে প্রজন্ম বদল সবসময়ই হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। নতুন তারকারা আসবেন, নতুন স্বপ্ন বুনবেন। কিন্তু মেসি, রোনালদো, মদ্রিচ কিংবা নেইমারদের মতো কিংবদন্তিরা যে আবেগ, স্মৃতি আর অসংখ্য অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, তা কখনো মুছে যাবে না। হয়তো তাদের পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসে, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তারা চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবেন।








