মেসির শেষ বিশ্বকাপ স্বপ্নের সাথে প্রতারণা করেছে আর্জেন্টিনা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের উচ্ছ্বাস যেমন ছিল চোখে পড়ার মতো, তেমনি বিপরীত চিত্র দেখা যায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির মুখে। ম্যাচ শেষে তাকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখা যায়। গ্যালারিতে উপস্থিত আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা যখন তার নাম ধরে গান গাইছিলেন, তখন মেসি দীর্ঘক্ষণ নীরবে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অনেকের কাছেই সেটি ছিল বিশ্বকাপে তার সম্ভাব্য শেষ বিদায়ের আবেগঘন মুহূর্ত।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামলেও স্পেনের বিপক্ষে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেনি আর্জেন্টিনা। বরং পুরো ম্যাচে দলের কৌশল ও পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনার ভুল পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছেন মেসি নিজেই।
স্কালোনির আবেগঘন প্রতিক্রিয়া
ফাইনাল শেষে সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিকে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, মেসির সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কথা বলতে বলতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সংবাদ সম্মেলন শেষ না করেই উঠে যান।
বিজ্ঞাপন
একই সময়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা ভাবছিলেন স্কালোনি। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
৩৯ বছরেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ
বয়স বাড়লেও লিওনেল মেসি নিজের খেলাকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেকের পর থেকে তিনি একাধিকবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন। বর্তমান আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির মেসি সেই দীর্ঘ অভিযোজনেরই ফল।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি নিজের অসাধারণ দক্ষতার ঝলক দেখিয়েছেন। তবে ফাইনালে দলের কৌশলগত দুর্বলতার কারণে তার প্রতিভা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
ভুল কৌশলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন মেসি
বিজ্ঞাপন
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা আক্রমণাত্মক ও শারীরিক লড়াইভিত্তিক ফুটবল খেলতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই কৌশল মেসির জন্য সুবিধার বদলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে পরিকল্পিত আক্রমণ চালালেও আর্জেন্টিনা বারবার ফাউল, শারীরিক সংঘর্ষ এবং ম্যাচের ছন্দ নষ্ট করার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। ফলে মেসি দীর্ঘ সময় বল থেকেই বিচ্ছিন্ন ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনা যদি স্বাভাবিক পাসিং ফুটবল খেলত, তাহলে মেসি ম্যাচে আরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারতেন।
বিজ্ঞাপন
রেফারিং নিয়েও বিতর্ক
ম্যাচের শুরুতেই স্পেনের দানি ওলমোর ওপর অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শক্ত ফাউলের ঘটনায় কড়া শাস্তি না দেওয়ায় রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত স্প্যানিশ সমর্থকদের একাংশ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানও দেন। যদিও ম্যাচ পরিচালনায় পক্ষপাতের অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু রেফারিং নিয়ে বিতর্ক ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
বিজ্ঞাপন
আক্রমণাত্মক আচরণে ছন্দ হারায় আর্জেন্টিনা
পুরো ম্যাচজুড়েই আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলারের আচরণ ছিল অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক। লিসান্দ্রো মার্তিনেস প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন মিকেল ওয়ারজাবালকে ফাউল করার কারণে।
অতিরিক্ত সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় পাও কুবার্সির ওপর অপ্রয়োজনীয় আক্রমণ করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। বদলি হিসেবে নামা লেয়ান্দ্রো পারেদেসও এরিক গার্সিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন এবং গাভির সঙ্গেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন।
বিজ্ঞাপন
শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যেও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্প্রভ ফাইনাল আর্জেন্টিনার
ফাইনালে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ ছিল সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো দল নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটি শটও নিতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
এমনকি ম্যাচের ১১৭তম মিনিটে মেসি প্রথমবার শট নেওয়ার সুযোগ পেলেও সেটি লক্ষ্যে রাখতে পারেননি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পারফরম্যান্সেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। স্পেন পুরো ম্যাচে লক্ষ্যে ১২টি শট নেয়, আর আর্জেন্টিনার অন-টার্গেট শট ছিল শূন্য।
প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে আর্জেন্টিনার সফল পাস ছিল মাত্র আটটি, অথচ একই সময়ে তারা নয়টি ফাউল করে। এতে স্পষ্ট হয় যে আক্রমণ গড়ে তোলার চেয়ে শারীরিক লড়াইয়েই বেশি মনোযোগী ছিল দলটি।
সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে অপূর্ণ বিদায়
এটি ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসির ৩৪তম ম্যাচ। বয়স বিবেচনায় অনেকেই মনে করছেন, এটিই হয়তো বিশ্বকাপে তার শেষ উপস্থিতি।
শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন পূরণ না হলেও ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মেসির অবস্থান অটুট। তবে অনেকের মতে, বিশ্বকাপের সম্ভাব্য শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার কৌশলই তার সেরা ফুটবল দেখানোর সুযোগ কেড়ে নিয়েছে।








