Logo

পৃথিবীতেই রয়েছে ‘এলিয়েন দ্বীপ’ ও ‘এলিয়েন মাছ’

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১০ জুন, ২০২৬, ১৪:৫৫
পৃথিবীতেই রয়েছে ‘এলিয়েন দ্বীপ’ ও ‘এলিয়েন মাছ’
ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীতে এমন কিছু স্থান ও প্রাণী রয়েছে, যেগুলো প্রথম দেখায় যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির অংশ বলে মনে হয়। অদ্ভুত আকৃতির গাছ, বিচিত্র প্রাণী আর বিস্ময়কর পরিবেশের কারণে আরব সাগরের সুকাত্রা দ্বীপকে অনেকেই ‘এলিয়েন দ্বীপ’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে গভীর সমুদ্রের এক বিরল মাছ, যার মাথা স্বচ্ছ কাচের মতো, সেটিকেও ‘এলিয়েন মাছ’ নামে ডাকা হয়।

বিজ্ঞাপন

যদিও দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই, তবুও তাদের অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। একটি পৃথিবীর অন্যতম বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, অন্যটি সমুদ্রের অন্ধকার গভীরতায় বসবাসকারী রহস্যময় প্রাণী।

আরব সাগরের মাঝখানে অবস্থিত সুকাত্রা পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য ভূখণ্ডগুলোর একটি। এটি মূলত চারটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জ, যার অধিকাংশ অংশ ইয়েমেনের অন্তর্ভুক্ত। মোট প্রায় ৩ হাজার ৭৯৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে ইয়েমেনের অংশ হলেও ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে। এ কারণেই অঞ্চলটি গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

২০০৮ সালে ইউনেস্কো সুকাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দীর্ঘকাল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এখানে এমন বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী বিকশিত হয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞানীদের ধারণা, সুকাত্রা একসময় প্রাচীন সুপারকন্টিনেন্ট গন্ডোয়ানার অংশ ছিল। পরে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় বিশ্বের অন্যান্য স্থানের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ থাকায় দ্বীপটিতে স্বতন্ত্র পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য গড়ে ওঠে। এ কারণেই এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীর বড় একটি অংশ স্থানীয় বা এন্ডেমিক প্রজাতির।

গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বীপের শত শত উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পৃথিবীর অন্য কোথাও স্বাভাবিকভাবে জন্মায় না।

বিজ্ঞাপন

সুকাত্রার সবচেয়ে পরিচিত ও বিস্ময়কর উদ্ভিদ হলো ‘ড্রাগন ব্লাড ট্রি’। দূর থেকে দেখতে এটি যেন বিশাল ছাতার মতো। গাছটির ডালপালা ওপরের দিকে ছড়িয়ে গিয়ে অদ্ভুত এক আকৃতি তৈরি করে, যা অনেকের কাছে ভিনগ্রহের উদ্ভিদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, গাছের কাণ্ডে আঘাত করলে লালচে রঙের আঠার মতো রস বের হয়। এই রস বিভিন্ন সময় রং, বার্নিশ এবং ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই গাছই মূলত সুকাত্রাকে ‘এলিয়েন দ্বীপ’ হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।

ড্রাগন ব্লাড ট্রির পাশাপাশি সুকাত্রায় রয়েছে আরও বহু বিরল উদ্ভিদ। এর মধ্যে ডেন্ড্রোসিসিয়াস নামের শসা জাতীয় গাছ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অস্বাভাবিক আকৃতির কাণ্ড এবং উজ্জ্বল রঙের ফুলের কারণে এটি গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফুলেল উদ্ভিদ, বিরল ঝোপঝাড় এবং শক্ত কাঠের গাছও এখানে জন্মে, যেগুলোর অনেকগুলোই কেবল এই দ্বীপেই পাওয়া যায়।

সুকাত্রার প্রাণিজগতও সমানভাবে আকর্ষণীয়। এখানে পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতির টিকটিকি, বিরল মাকড়সা, কাঁকড়া এবং অসংখ্য কীটপতঙ্গ।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বীপে পাওয়া অধিকাংশ সরীসৃপ ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী স্থানীয় প্রজাতির। অর্থাৎ এগুলোর স্বাভাবিক আবাস পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। তবে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি খুবই সীমিত। বাদুড় ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী এখানে পাওয়া যায় না।

সুকাত্রা শুধু প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্যই নয়, ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এখানে প্রাচীন মানব বসতির নানা নিদর্শন পাওয়া গেছে। গবেষকরা বহু পুরোনো হাড়, প্রত্নবস্তু এবং শিলালিপি আবিষ্কার করেছেন।

প্রাচীনকালে এটি সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত ছিল। ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সভ্যতার মানুষের আনাগোনা ছিল এখানে।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৯ সালে বিমানবন্দর স্থাপনের পর সুকাত্রায় যাতায়াত সহজ হয়। এর আগে মূলত সমুদ্রপথই ছিল একমাত্র ভরসা। বর্তমানে প্রকৃতিপ্রেমী, গবেষক এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের কাছে এটি অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চাপ দ্বীপটির জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

‘এলিয়েন দ্বীপ’ পৃথিবীর স্থলভাগের বিস্ময় হলেও ‘এলিয়েন মাছ’ সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা আরেক রহস্য। এই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাক্রোপিনা মাইক্রোস্টোমা। অনেকেই একে ‘স্পুক ফিশ’ নামেও চেনেন। এটি আটলান্টিক, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের গভীর অঞ্চলে বসবাস করে। সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার ফুট গভীরে এর দেখা মেলে।

এই মাছকে অন্য সব সামুদ্রিক প্রাণী থেকে আলাদা করেছে এর স্বচ্ছ মাথা। মাছটির শরীরের বেশিরভাগ অংশ গাঢ় রঙের হলেও মাথার ওপরের অংশ কাচের মতো স্বচ্ছ। সেই স্বচ্ছ আবরণের ভেতর দেখা যায় উজ্জ্বল সবুজ রঙের দুটি চোখ।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মাছটির চোখ স্থির অবস্থায় থাকে এবং কেবল ওপরের দিকে দেখতে সক্ষম। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় জানা যায়, বাস্তবে চোখ দুটি ঘুরতে পারে এবং বিভিন্ন দিকে তাকিয়ে খাদ্য শনাক্ত করতে সক্ষম।

যে গভীরতায় এই মাছ বাস করে সেখানে সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না। ফলে অন্ধকার পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এর দৃষ্টিশক্তি বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষকদের মতে, খাদ্য খোঁজা এবং শিকার শনাক্ত করার জন্য মাছটির চোখ অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রয়োজন হলে এটি প্রায় চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

গভীর সমুদ্রের এই প্রাণীকে খুব কমবারই ক্যামেরাবন্দি করা সম্ভব হয়েছে। আধুনিক রোবোটিক সাবমার্সিবল ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার সাহায্যে গবেষকেরা এর ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।

দশকের পর দশক গবেষণার পরও মাছটি সম্পর্কে অনেক তথ্য এখনো অজানা রয়ে গেছে। এ কারণেই এটি সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্যময় প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয়। সুকাত্রার অদ্ভুত গাছপালা হোক কিংবা গভীর সমুদ্রের স্বচ্ছমাথা মাছ—দুটি উদাহরণই প্রমাণ করে যে পৃথিবীতে এখনও অসংখ্য বিস্ময় লুকিয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

যে কারণে অনেক গবেষক মনে করেন, আমাদের নিজস্ব গ্রহই এত বৈচিত্র্যময় ও রহস্যে ভরা যে কখনো কখনো তা ভিনগ্রহের জগতকেও হার মানায়। আর সেই কারণেই সুকাত্রা ও ‘এলিয়েন মাছ’ আজও বিজ্ঞানী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে বিস্ময়ের নাম।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD