Logo

মৃত্যুর ৪ দিন পর আইসিইউতে সিরিয়াল পেলেন আড়াই বছরের নুসাইবা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহী
২৬ মার্চ, ২০২৬, ১৩:৩৬
মৃত্যুর ৪ দিন পর আইসিইউতে সিরিয়াল পেলেন আড়াই বছরের নুসাইবা
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার অভাবে অপেক্ষমাণ অবস্থায় ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ১১ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে এসব মৃত্যু ঘটে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল পর্যন্ত আরও ৩৮ শিশু আইসিইউ বেডের জন্য অপেক্ষায় ছিল।

বিজ্ঞাপন

আড়াই বছরের নুসাইবা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি ছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে আইসিইউতে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও অপেক্ষমাণ তালিকায় তার অবস্থান ছিল ২২ নম্বরে। সিরিয়াল আসার আগেই ১২ মার্চ তার মৃত্যু হয়। চার দিন পর হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয়, তার আইসিইউর পালা এসেছে। শিশুটি পাবনার চাটমোহর উপজেলার কাঠেংগা গ্রামের বাসিন্দা সবুজ আলীর সন্তান।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়া এলাকার বাসিন্দা সাহিদের সন্তানের ক্ষেত্রেও। তার ছেলে নাহিদ ১৩ মার্চ মারা যায়। চিকিৎসক আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও তিন দিন চেষ্টার পরও তাকে সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

১৯ মার্চ সকালে অপেক্ষমাণ তালিকার ৩৭ নম্বরে থাকা আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। সন্তানের মৃত্যুতে ভেঙে পড়া মা অভিযোগ করে বলেন, নানা জায়গায় চেষ্টা করেও আইসিইউ বেড পাননি, পেলে হয়তো সন্তানকে বাঁচানো যেত।

রামেক হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল মনে করেন, সময়মতো আইসিইউ সেবা পেলে এই ৩৩ শিশুর অনেকেই বেঁচে যেতে পারত। তিনি জানান, রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতালের মধ্যে এটিই একমাত্র ডেডিকেটেড ১২ শয্যার শিশু আইসিইউ, যা বিশেষ ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি ঢাকা বিভাগের রোগীরাও এখানে চিকিৎসার জন্য আসছেন।

আইসিইউ মূলত সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা। সরকারি হাসপাতালে এর খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি খাতে তা অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রোগীদের আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩’ অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে সরকারি উদ্যোগে ৭২৮টি নতুন আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়েছে। তবে মোট আইসিইউ শয্যার সংখ্যা সেখানে উল্লেখ নেই। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১ হাজার ১২৬টি, আর বেসরকারি পর্যায়ে আছে প্রায় এক হাজার।

দেশের বড় হাসপাতালগুলোতেও একই সংকট দেখা যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, আইসিইউতে প্রতিদিন ১৫০ জন আবেদন করলেও ভর্তি করা যায় মাত্র ২০ থেকে ৩০ জনকে। জনবল সংকট ও যন্ত্রপাতির সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তি রোগীদের অন্তত ১০ শতাংশের জন্য আইসিইউ সুবিধা থাকা দরকার হলেও তার অর্ধেকও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬০ শয্যার একটি বড় আইসিইউ কমপ্লেক্স নির্মিত হলেও এখনো সরকারি অনুমোদন পায়নি। এর মধ্যে ৪০টি প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২০টি শিশুদের জন্য নির্ধারিত। বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমিত পরিসরে এটি চালু রেখেছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে শিশুদের জন্য নির্ধারিত ২০ শয্যার আইসিইউ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম জানান, বর্তমানে চালু থাকা ৪০ শয্যার আইসিইউ পুরোপুরি হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে, এতে সরকারের কোনো জনবল নিয়োগ নেই।

অন্যদিকে, রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর এলাকায় ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি। সেখানে ১০ শয্যার শিশু আইসিইউ থাকলেও জনবল কাঠামো অনুমোদন না পাওয়ায় সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, রাজশাহীতে শিশু হাসপাতাল ও আইসিইউর অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও কার্যকর করতে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতা।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD