পার্বত্য রাজনীতিতে মানবিকতার জনআস্থার প্রতীক সাজাইমং মারমা

পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের নাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম সাজাইমং মারমা। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, তৃণমূল মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, মানবিকতা, সাহসিকতা এবং উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, সংকটে সাহসী ভূমিকা নেওয়া এবং উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে নিরলস কাজ করাই তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৪ সালের ২১ জুন রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার মহাজন পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন সাজাইমং মারমা। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মানবিক ও সমাজমুখী চিন্তার অধিকারী। পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ তাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়। ছোটবেলা থেকেই অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়া এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা তার মধ্যে ছিল স্পষ্ট। এই মানবিক গুণাবলীই পরবর্তীতে তার নেতৃত্বগুণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বেতবুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও তার মনোযোগ সবসময় ছিল জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। মানুষের সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের চেষ্টা তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
বিজ্ঞাপন
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ জন্ম নেয়। তিনি বলেন, আমি ছাত্রজীবন থেকেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আদর্শে বিশ্বাসী। ইতিহাস থেকে জেনেছি, আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের পরিচয় ও মর্যাদার প্রশ্নে যে স্বীকৃতি ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়েই সুস্পষ্টভাবে উঠে আসে। সেই উপলব্ধি থেকেই বিএনপির প্রতি আমার একধরনের আবেগ ও দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।
এই আদর্শিক বিশ্বাস থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৯ সালে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের হাত ধরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। সেই থেকেই তার সরাসরি রাজনৈতিক পথচলা শুরু। তার বিশ্বাস, রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তৃণমূল পর্যায় থেকে ধাপে ধাপে নিজেকে গড়ে তুলে তিনি একজন দক্ষ সংগঠক ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২০০৯ সালেই তিনি কাউখালী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করেন। কর্মীদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তীতে তিনি রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে থেকে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিকাশেও ভূমিকা রাখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সংস্কৃতি একটি সমাজের মেরুদণ্ড, যা মানুষের মূল্যবোধ ও চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বর্তমানে সাজাইমং মারমা কাউখালী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি, রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য এবং জেলা জিয়া মঞ্চের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদের রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। এই বহুমাত্রিক দায়িত্ব তার নেতৃত্বগুণ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল সামাজিক বাস্তবতায় তিনি সবসময় ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছেন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তিনি সোচ্চার ছিলেন। পাশাপাশি পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। তার এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিজ্ঞাপন
তার রাজনৈতিক জীবন ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। গত ১৫ বছরে তাকে একাধিক মামলার সম্মুখীন হতে হয়, যা তার রাজনৈতিক পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তিনি সব মামলায় বেকসুর খালাস পান। এই কঠিন সময়ে তিনি ধৈর্য, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি পিছুয়ে যাননি, বরং আরও দৃঢ়ভাবে মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য, কাউখালী উপজেলা মনিটরিং উপ-কমিটির আহ্বায়ক এবং জিয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাঠপর্যায়ে তার সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনী কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে তোলে।
বিজ্ঞাপন
রাজনীতির পাশাপাশি কর্মজীবনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত একটি বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সংস্থায় প্রজেক্ট অফিসার হিসেবে কাজ করেন। মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, নারী ক্ষমতায়ন এবং প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও তিনি বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিও এফ পি)-এর অধীনে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তার পরিবার সশস্ত্র হামলার শিকার হয়। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপে তারা নিরাপদে উদ্ধার পান। ভয়াবহ এই ঘটনার পরও তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং আরও দৃঢ়ভাবে মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
বিজ্ঞাপন
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার মেয়ে ফেনী ক্যাডেট কলেজ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করলেও তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) লং কোর্সে সুযোগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে তার মেয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এ অধ্যয়নরত। এই ঘটনা তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে বেদনাদায়ক হলেও তিনি এটিকে সংগ্রামের অংশ হিসেবেই দেখেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও বেতবুনিয়া থেকে তরুণদের চট্টগ্রামের বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য পাঠান এবং তাদের আর্থিক ও মানসিকভাবে সহায়তা প্রদান করেন। তার এই ভূমিকা তরুণদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বেতবুনিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। দীপঙ্কর তালুকদারের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি কলেজের নাম পরিবর্তনের দাবিতে তিনি রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে ও দাবির প্রেক্ষিতে অবশেষে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে “বেতবুনিয়া কলেজ” রাখা হয়। তিনি নিজেই প্রথম এই নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেন এবং আন্দোলনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করেন। এই ঘটনা তার দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় জনগণের কাছে সাজাইমং মারমা একজন সৎ, সাহসী ও জনমুখী নেতা হিসেবে পরিচিত। তার সহজ জীবনযাপন, মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতা তাকে আলাদা করেছে।
এলাকাবাসীর বিশ্বাস, তিনি যদি রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, তাহলে তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণ পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নিজের বক্তব্যে সাজাইমং মারমা বলেন, আমি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চাই। আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে আমি আন্তরিকভাবে কাজ করতে চাই।
বিজ্ঞাপন
সব মিলিয়ে সাজাইমং মারমার জীবন ও কর্ম কেবল একজন রাজনীতিবিদের গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, সাহস, মানবিকতা ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে—সত্যিকারের নেতৃত্ব ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের আস্থা অর্জন এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত।
রাঙ্গামাটির মানুষ এখন নতুন প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাদের বিশ্বাস—তার সততা, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ভবিষ্যতেও তিনি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা নিয়েই এগিয়ে যাবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।








