Logo

স্ত্রীকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দিলেন স্বামী

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
শরীয়তপুর
১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:০০
স্ত্রীকে বাঁচাতে নিজের কিডনি দিলেন স্বামী
ফাইল ছবি।

ভালোবাসা যে শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তা প্রমাণ করা যায়, শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন যেন তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী মিনারা বেগমকে বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দান করে তিনি সৃষ্টি করেছেন মানবিকতা ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো শরীয়তপুর জুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা একে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের বিরল নিদর্শন হিসেবে দেখছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে ৩২ বছর বয়সী মিনারা বেগম উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার দুটি কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। পাশাপাশি পেটের ভেতরে একটি টিউমারও শনাক্ত হয়। এতে পুরো পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে মিনারাকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার মাধ্যমে টিউমারের সমস্যা কিছুটা সমাধান হলেও আর্থিক সংকটে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব হচ্ছিল না। অবস্থার অবনতি হলে শুরু হয় কিডনি ডোনারের খোঁজ। একপর্যায়ে মিনারার মা কিডনি দিতে সম্মত হলেও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার হৃদরোগ ধরা পড়ায় সেটিও সম্ভব হয়নি।

এমন সংকটময় সময়ে স্ত্রীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান স্বামী মো. জসিম উদ্দিন (৩৬)। কোনো দ্বিধা না করে তিনি নিজের একটি কিডনি দানের সিদ্ধান্ত নেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে গত ৫ মার্চ ঢাকার শ্যামলীর সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে মিনারার শরীরে তার কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়।

অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন মিনারা বেগম। বর্তমানে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকার শ্যামলীতে ভাড়া বাসায় থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বসকাঠি গ্রামের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও মিনারা বেগম ২০০৭ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনের দেড় বছরের মাথায় জন্ম নেয় তাদের একমাত্র সন্তান তামিম আল মারুফ, যিনি বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন।

২০২৪ সালের শুরুতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকেই মিনারার জটিল কিডনি রোগ ধরা পড়ে। এরপর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চললেও ধীরে ধীরে তার অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। এমন কঠিন সময়ে স্বামীর এই আত্মত্যাগ শুধু একটি জীবনই রক্ষা করেনি, বরং ভালোবাসার গভীরতাকেও নতুন করে তুলে ধরেছে।

বিজ্ঞাপন

মুঠোফোনে মিনারা বেগম বলেন, “আমার অসুস্থতার কথা জানার পর আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। সংসারের সীমিত আয়, ছেলের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছিলাম। আমার মা কিডনি দিতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। তখন আমার স্বামী বললেন, ‘বাঁচলে একসঙ্গে বাঁচব, মরলেও একসঙ্গে মরব।’ অনেকবার বাধা দিলেও শেষ পর্যন্ত তার কিডনিই আমার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। আল্লাহর রহমতে এখন আমরা ভালো আছি। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”

অন্যদিকে জসিম উদ্দিন বলেন, “স্ত্রীর এমন পরিস্থিতিতে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখন সিদ্ধান্ত নিই, বাঁচলে দুজনেই বাঁচব। চিকিৎসকদের পরামর্শে সব পরীক্ষা শেষে নিজের ইচ্ছাতেই কিডনি দান করেছি। স্ত্রীকে সুস্থ দেখতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম নাসির উদ্দিন স্বপন বলেন, “স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে নিজের কিডনি দিয়ে জসিম উদ্দিন একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এটি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের অসাধারণ উদাহরণ। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, এই দম্পতি সুস্থ ও ভালো থাকুক।”

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD