Logo

৩৮ বছর যাকে খুঁজে ক্লান্ত স্বজনরা, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়লেন তিনি

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
মেহেরপুর
২ জুন, ২০২৬, ১৮:৩৩
৩৮ বছর যাকে খুঁজে ক্লান্ত স্বজনরা, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়লেন তিনি
ছবি: সংগৃহীত

একটি বাড়ি। একটি অপেক্ষা। একটি দীর্ঘশ্বাসে ভরা জীবন। একটি পরিবারের দীর্ঘ ৩৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটল এক আবেগঘন প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে। যে মানুষটিকে একসময় হারিয়েই ফেলেছিলেন স্বজনরা, যাকে নিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল সব আশা-ভরসা, সেই মানুষই হঠাৎ ফিরে এলেন নিজের বাড়িতে। আর তাতেই আনন্দ, বিস্ময় ও কান্নায় ভরে ওঠে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দি গ্রামের একটি পরিবার।

বিজ্ঞাপন

ফিরে আসা ওই ব্যক্তির নাম জবেদ আলী (৬৬)। তিনি বামন্দি গ্রামের প্রয়াত তোফাজ্জল মণ্ডলের ছেলে। প্রায় চার দশক আগে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ মেলেনি। পরিবার-পরিজন ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু সব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে সোমবার বিকেলে তিনি ফিরে আসেন নিজের জন্মভিটায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেলে গ্রামের একটি রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যেতে দেখা যায় এক বৃদ্ধকে। বয়সের ছাপ স্পষ্ট তার শরীরে ও মুখে। তবে তখনও কেউ বুঝতে পারেননি, এই মানুষটিই গ্রামের বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া জবেদ আলী।

বিজ্ঞাপন

বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ানোর পরই ঘটে অবিশ্বাস্য এক ঘটনা।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় ক্লান্ত স্ত্রী রুশিয়া খাতুন প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর যেন চিনতে পারেন সেই চেনা মুখ। তারপর বুকফাটা আর্তনাদ ‘ওই তো আমার মানুষ!’

চিৎকার শুনে ছুটে আসেন পরিবারের সদস্যরা। মুহূর্তেই কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে বাড়ির আঙিনা। কেউ তার হাত ধরে কাঁদছেন, কেউ বুকে জড়িয়ে ধরে হারানো সময়কে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

বিজ্ঞাপন

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে পারিবারিক অভিমান থেকে চার বছরের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও স্ত্রী রুশিয়া খাতুনকে রেখে হঠাৎ বাড়ি ছাড়েন জবেদ আলী। এরপর বছরের পর বছর খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কখনো শোনা গেছে তিনি নাকি দেশের এক প্রান্তে আছেন। কখনো গুজব উঠেছে তিনি মারা গেছেন। প্রতিটি খবরের পেছনে ছুটেছেন স্বজনরা। কিন্তু সবশেষে ফিরে এসেছে শুধু হতাশা।

অপেক্ষা করতে করতে একসময় বৃদ্ধ হয়ে যান মা। ছেলের ফেরার আশায় পথ চেয়ে থাকতে থাকতেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। একই পরিণতি হয় দাদিরও। কিন্তু তাদের সেই প্রতীক্ষার অবসান আর দেখা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

জবেদ আলীর স্ত্রী রুশিয়া খাতুন বলেন, প্রথম কয়েক বছর প্রতিদিনই মনে হতো, হয়তো আজই ফিরে আসবেন তিনি। এরপর মাস পেরিয়ে বছর, বছর পেরিয়ে যুগ কেটে গেছে। অনেকেই বলতেন, তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার মন কখনো সেই কথা বিশ্বাস করতে পারেনি। আজ যখন সামনে দেখলাম, মনে হলো আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, যখন নিজের চোখে তাকে সামনে দেখলাম, তখন মনে হলো আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন ফিরে দিয়েছেন।’ আমার ছেলে যখন তার বাবাকে শেষবার দেখেছিল, তখন সে মাত্র চার বছরের শিশু। এখন সে বিদেশে থাকে। বাবার ফিরে আসার খবর শুনে সে আবেগাপ্লুত হয়েছে এবং দেশে ফিরে বাবার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছে।

গ্রামের প্রবীণরা জানান, জবেদ আলী শুধু একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন গ্রামের পরিচিত মুখ। লাঠিখেলায় তার ছিল দারুণ সুনাম। যাত্রাপালার মঞ্চে তার অভিনয় দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত।

বিজ্ঞাপন

চাচাতো ভাই বক্কার আলী বলেন, ‘জবেদ ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের গ্রামের ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিল। নতুন প্রজন্ম শুধু গল্প শুনেছে। আজ সেই গল্পের মানুষটিকে সামনে দেখে সবাই বিস্মিত।’

এদিকে নিজের জীবনের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি জবেদ আলী।

চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘অভিমান ছিল। সেই অভিমানেই চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু যত দূরেই গেছি, পরিবারের কথা ভুলতে পারিনি। রাতে কাজ শেষে একা বসে স্ত্রী-সন্তানের কথা ভাবতাম। অনেক সময় কান্না চলে আসত। তবু ফিরে আসার সাহস পাইনি।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকের কাজ করেছি। জীবন চলেছে, কিন্তু মন চলেনি। মানুষের ভিড়ে থেকেও আমি একা ছিলাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, সংসারের ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। তাই শেষ বয়সে সব অভিমান মুছে ফিরে এলাম নিজের মানুষের কাছে।

দীর্ঘ ৩৮ বছরের বিচ্ছেদের পর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো গ্রামের মানুষের কাছেই এক বিরল ও আবেগঘন ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD