Logo

যে বাড়িতে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে চলছে কবরের প্রস্তুতি

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
যশোর
২ জুন, ২০২৬, ১৯:১৭
যে বাড়িতে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে চলছে কবরের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ১১ বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে ঈদুল আজহার ছুটিতে দেশে ফিরেছিলেন আরিফুল ইসলাম। পরিবারের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানো, বিয়ের প্রস্তুতি এবং নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। বুধবার (৩ জুন) তার মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। পরিবারেও ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তার জীবন। একই সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন তার মা, ভাই ও বোন। ফলে যে বাড়িতে আনন্দ-উৎসবের আবহ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্না আর শোকের মাতম।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২ জুন) ভোররাতে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এতে নিহত হন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলাম (৩০), তার মা নুরজাহান বেগম, বোন আয়েশা আক্তার (৩২) এবং ছোট ভাই রাকিবুল ইসলাম (১৮)। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রাইভেটকারচালক জাহিদ হোসেন, যার বাড়ি পার্শ্ববর্তী মনিরামপুর উপজেলার গৌরপুর গ্রামে।

জানা গেছে, ভূমিহীন পরিবারের সন্তান আরিফুল ১১ বছর আগে সংসারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। সেখানে উপার্জনের টাকায় ৫ শতক জমি কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। সোমবার (১ জুন) রাতে ছুটিতে দেশে ফেরেন। এক বুক আশা ও আনন্দ নিয়ে তাকে স্বাগত জানাতে ঢাকায় বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন মা নুরজাহানসহ পুরো পরিবার। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মা, ভাই ও বোনকে নিয়ে চিরবিদায় নিলেন তিনি। এখন সেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

বিজ্ঞাপন

আরিফুলের পাশাপাশি এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- আরিফুলের মা নুরজাহান বেগম, বোন আয়েশা আক্তার (৩২) ও ছোট ভাই রাকিবুল ইসলাম (১৮)। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রাইভেট কারের চালক জাহিদ হোসেন। তিনি পার্শ্ববর্তী মনিরামপুর উপজেলার গৌরপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন আরিফুলের বোনের মেয়ে মোছা. তাসফিয়া (৩) ও ছেলে মো. হুসাইন (৬)।

ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সংঘটিত ওই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

নিহত আরিফুলের মামা নজরুল ইসলাম বলেন, আরিফ ১১ বছর বিদেশ ছিল। সোমবার দিবাগত রাতে বিমানবন্দরে নেমেছিল। তাকে আনতে গিয়েছিল মা, ভাই, বোন ও ভাগনে-ভাগনি । ফেরার পথে একই পরিবারের চারজন মারা গেছে। বাবা ছাড়া পরিবারে কেউ নেই।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর আলম জানান, মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিদেশে গিয়েছিলেন আরিফুল। একসময় তাদের পরিবারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। অনেক কষ্ট করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সুখের সময় উপভোগ করার আগেই পরিবারের চারজন সদস্যকে হারাতে হলো।

আরিফুলের দুলাভাই ইলিয়াস হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরেছিলেন তার বড় শ্যালক। তাকে আনতে পরিবারের সবাই বিমানবন্দরে গিয়েছিল। কিন্তু ফেরার পথে এমন দুর্ঘটনা ঘটবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তিনি বলেন, যে বাড়িতে আনন্দের পরিবেশ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্না আর শোকের আবহ।

বিজ্ঞাপন

মামাতো ভাই মিন্টু রহমান বলেন, এই পরিবারটি খুবই দরিদ্র ছিল। ভূমিহীন ছিল। সংসারের সুখ ফেরাতে বিদেশ গিয়েছিল। বাড়ির জন্য জমি কিনেছিল, বাড়ি করেছে। এখন সেই বাড়িতেই শোকের মাতম চলছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মোসলেম উদ্দিন জানান, দেশে ফিরে আরিফুলের বিয়ে করার কথা ছিল। বুধবার মেয়ে দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সবকিছু এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। তিনি বলেন, পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে শুধু বাড়িতে থাকার কারণে বেঁচে গেছেন বাবা শহিদুল ইসলাম। স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হারিয়ে তিনি এখন বাকরুদ্ধ। তার পুরো পৃথিবীটাই এখন শূন্য।

বাঁকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিস-উর রহমান বলেন, আরিফুলের মা নুরজাহান বেগম সংরক্ষিত ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করায় এলাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে খোশালনগর-বালিয়াডাঙ্গা গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও জানান, আরিফুল ইসলাম, তার মা নুরজাহান বেগম এবং ভাই রাকিবুল ইসলামের দাফনের জন্য বাড়ির পাশে তিনটি কবর খোঁড়া হচ্ছে। অন্যদিকে আয়েশা আক্তারকে তার স্বামীর বাড়ি উজ্জ্বলপুর গ্রামে দাফন করা হবে। একদিন যে পরিবার নতুন স্বপ্নের অপেক্ষায় ছিল, আজ সেই পরিবারকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে চারটি কবর।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD