Logo

নদী খননের মাটি এখন আশ্রয়ণ বাসিন্দাদের ‘গলার কাঁটা’

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
খুলনা
১৬ জুন, ২০২৬, ২১:৪০
নদী খননের মাটি এখন আশ্রয়ণ বাসিন্দাদের ‘গলার কাঁটা’
ছবি: সংগৃহীত

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে নদী খননের মাটি ফেলার কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকদিন ধরে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, ঘরের পেছনে বিপুল পরিমাণ মাটি ফেলার ফলে টয়লেট ব্যবহার, রান্নাবান্না এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তপতি দাস বলেন, ঘরের পেছনে মাটি জমে যাওয়ায় টয়লেটের ট্যাংকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। রান্নাঘর ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে বাইরে ইট সাজিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে সেই সুযোগও থাকে না। ফলে পরিবার-পরিজনের খাবারের ব্যবস্থা করতেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গরমের কারণে শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলেও জানান তিনি।

একই প্রকল্পের আরেক বাসিন্দা মুন্নি বেগম বলেন, মাটির চাপে রান্নাঘর, বাথরুম ও ঘরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকদিন ধরে নিজেরা কষ্ট করে মাটি সরানোর চেষ্টা করছেন। পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কিছু মাটি অপসারণ করা গেলেও পুরো কাজ সম্পন্ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রমিক নিয়োগ করাও সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকে নদী খননের কাজ চলছিল। তবে সম্প্রতি হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ মাটি এনে ফেলা হলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘর ক্ষতির মুখে পড়ে। বাথরুমের ট্যাংকি নষ্ট হয়ে গেছে, দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে মাটি সরানোর সময় ঘরগুলো কেঁপে ওঠে। দরিদ্র বাসিন্দাদের জন্য এটি নতুন সংকট তৈরি করেছে।

বাসিন্দা বেবি বেগমের অভিযোগ, টিনের চাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মাটির কারণে রান্নার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। টয়লেট ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে শিশুদের কষ্ট আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, এই অবস্থায় বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

চামেলী দাস নামের আরেক বাসিন্দা জানান, নদী খননের মাটির চাপ ঘরবাড়ির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাথরুমের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি নিজেও অসুস্থ এবং বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাস্থ্যগত সমস্যা আরও বাড়ছে। শিশুদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন বলেন, বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে মোট ১২৫টি ঘর রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় গত দুই দিনে অধিকাংশ মাটি অপসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।

গত ১৪ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসনের নজরে আসে ঘটনাটি। এরপর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পেছনে জমে থাকা মাটি অপসারণের কাজ শুরু হয়। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাতসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন।

বিজ্ঞাপন

পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত বলেন, যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ভদ্রাসহ কয়েকটি নদী খননের কাজ চলমান রয়েছে, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কিছু সুবিধাভোগী পরিবারের ক্ষতির খবর পাওয়ার পরই সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে তিনি সেখানে যান।

তিনি আরও বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের ফলে যদি কোনো পরিবার ক্ষতির মুখে পড়ে, তাহলে সেই ক্ষতি নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার বিষয়েও প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে ভদ্রাসহ ছয়টি নদীর প্রায় ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় খননকাজ চলছে। চুকনগর থেকে বরাতিয়া পর্যন্ত নদীতীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৪০০টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর রয়েছে। নদী খননের মাটি সংরক্ষণের কারণে এসব ঘরের একটি বড় অংশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ফলে অনেক পরিবারকে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। তবে প্রশাসনের আশ্বাস ও চলমান মাটি অপসারণ কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD