২৪ ঘণ্টায়ও কাটেনি জলাবদ্ধতা, পানিতে আটকা হাজারো মানুষ

গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌর এলাকায় টানা একদিন পার হলেও জলাবদ্ধতার পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। পানিতে ডুবে থাকা বিভিন্ন মহল্লার হাজারো পরিবার এখনো চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে গেছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ভবনের ছাদ, সড়কের উঁচু স্থান কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড, হরিণহাটি, বিশ্বাসপাড়া, পল্লিবিদ্যুৎ এলাকা, দিঘিরপাড়, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ডাইনকিনি, হরতিকতলা, চন্দ্রাসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকায় এখনো পানি জমে রয়েছে। স্থানীয়দের হিসাবে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছেন।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের জন্য থাকা ড্রেন ও নালাগুলোর কার্যকারিতা না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি। ফলে একদিনের বেশি সময় ধরে পানি আটকে থেকে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।
বিজ্ঞাপন
জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকার সাবমারসিবল পাম্প ও টিউবওয়েল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানিবন্দি মানুষজন দূরের এলাকা থেকে বোতল, ড্রাম ও কন্টেইনারে করে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রান্না করাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে খাবার সংকটও দেখা দিয়েছে অনেক পরিবারের মধ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দা রেদুয়ান হাসান জানান, আগের দিন সকাল থেকে তার বাড়ি পানিতে ডুবে রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারলেও ঘরের ভেতরের কোনো জিনিসপত্র বের করতে পারেননি। কোমরসমান পানি পেরিয়ে মাঝে মাঝে বাড়ির সামনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে আবার ফিরে আসতে হচ্ছে তাকে।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ওসমান মিয়া বলেন, তার মুদি দোকানের প্রায় সব পণ্য পানিতে নষ্ট হওয়ার পথে। ঋণ নিয়ে ব্যবসার জন্য মালামাল কিনেছিলেন, কিন্তু হঠাৎ জলাবদ্ধতায় সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিজ্ঞাপন
গৃহবধূ রোজি আক্তার জানান, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ে কেনা আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র পানির কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরে ময়লা পানি জমে থাকায় সাপ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপদ্রবও বেড়েছে। এতে পরিবার নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও রয়েছেন তারা।
এদিকে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি নিষ্কাশনের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
কালিয়াকৈর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন জানান, জমে থাকা পানি দ্রুত সরানোর জন্য ড্রেন ও খাল পরিষ্কারের কাজ চলছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়ায় বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা চাপ সামলাতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, প্রধান খালগুলো দিয়ে পানি নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও এ কাজে সহযোগিতা করছেন। পানি কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জুন ভোরে মাত্র দুই ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে কালিয়াকৈর পৌর এলাকার বিভিন্ন অংশ আকস্মিকভাবে প্লাবিত হয়। এতে আবাসিক এলাকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানায় পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বিজ্ঞাপন
সেই সময় অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে টিনের চাল, সড়কের উঁচু অংশ এবং বহুতল ভবনের ছাদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। একদিন পেরিয়ে গেলেও পানি না নামায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বর্তমানে পানিবন্দি পরিবারগুলোর প্রধান উদ্বেগ নিরাপদ পানীয় জল, খাদ্য এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসা। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ নানা ধরনের মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।








