বগুড়ায় ৭ শ্রমিকের মৃত্যু, হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি

ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তারা। কেউ কৃষিকাজের জন্য, কেউবা দিনমজুরের কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন বগুড়ার এরুলিয়ার কামলার হাটে। দিন শেষে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার প্রত্যাশাই ছিল তাদের। কিন্তু সেই প্রত্যাশা মুহূর্তেই পরিণত হয় মর্মান্তিক পরিণতিতে। নিয়ন্ত্রণ হারানো শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের বাসের চাপায় প্রাণ হারান সাত শ্রমিক।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোরের এ দুর্ঘটনার পর বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মর্গ এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। দুপুরে হাসপাতালের করিডোরজুড়ে ছিল স্বজনদের কান্না, আহাজারি আর বুকফাটা আর্তনাদ। একের পর এক মরদেহ দেখে শোকে ভেঙে পড়েন নিহতদের স্বজনরা।
স্বামী আবু সাঈদ মণ্ডলের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন স্ত্রী রিনা বেগম। কখনো স্বামীর মরদেহ জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, আবার কখনো বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেলে?’ পাশে থাকা স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রিয়জন হারানোর শোক যেন কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছিলেন না তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আবু সাঈদ ও আমিরুলের স্বজন সানাউল প্রধান বলেন, দুজনই দিনমজুর ছিলেন। আবু সাঈদের পরিবারের সদস্য ছয়জন। সংসারের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধেই ছিল। কাজের সন্ধানে বগুড়ায় এসেছিলেন তিনি। কিন্তু কাজ শেষে আর বাড়ি ফেরা হয়নি।
তিনি জানান, নিহত আমিরুলও ছিলেন ভূমিহীন। এক শতক জমির ওপর ছোট একটি ঘর বানিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তার পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
নিহত নূর মোহাম্মদের ভাতিজা আল আমিন বলেন, ফজরের নামাজ আদায় করে তার চাচা কৃষিশ্রমিক নেওয়ার জন্য কামলার হাটে গিয়েছিলেন। কে জানত, সেটিই হবে তার জীবনের শেষ যাত্রা।
বিজ্ঞাপন
কৃষিশ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ভোর ৫টার পর থেকেই এরুলিয়ার কামলার হাটে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা জড়ো হন। কৃষিজমির মালিকরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যান। নিহত ও আহতদের অনেকেই সেখানে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষে থাকতেন।
তিনি বলেন, প্রতিদিনের মতো তারও সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিছুটা দেরি হয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন চারদিকে মানুষের ভিড়, রক্তাক্ত মানুষ ও আর্তনাদ। তখন অন্যদের সঙ্গে তিনিও আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে যান।
আরেক শ্রমিক মোশাররফ হোসেন সরকার বলেন, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শ্রমিকরা এই হাটে আসেন। বর্তমানে কৃষিকাজে একজন শ্রমিক দৈনিক প্রায় ৭০০ টাকা মজুরি পান। এই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করে বহু পরিবারের জীবন-জীবিকা।
বিজ্ঞাপন
যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের সদর উপজেলার এরুলিয়া সিলকিবান্ধা এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা থেকে নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে কাজের অপেক্ষায় থাকা কৃষিশ্রমিকদের ওপর উঠে যায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন—তাজিমুল (৪৭), বেল্লাল হোসেন, আবু সাঈদ (৪৫), আনারুল (৫৫), আমিরুল (৪০), নূর আলম (৪৫) ও জমির মালিক নূর মোহাম্মদ (৭৬)।
মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় একসঙ্গে সাতটি পরিবারের স্বপ্ন থমকে গেছে। জীবিকার সন্ধানে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষগুলোর আর ঘরে ফেরা হয়নি। তাদের মৃত্যুতে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল চত্বর।








