প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো অক্ষরকে ঘিরে স্বজনদের আহাজারি

কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ৩০ বছর বয়সী অক্ষর শৌভিক রায়ের মরদেহ খুলনায় পৌঁছানোর পর হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে মায়ের কান্না আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল থেকে খুলনা নগরের হাদিস পার্ক-সংলগ্ন মান্নান চটপটির গলির একটি ছয়তলা ভবনের সামনে স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা মরদেহবাহী গাড়ির অপেক্ষায় ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সটি সেখানে পৌঁছালে শোকের মাতমে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
মরদেহের গাড়ির দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন অক্ষরের মা শুক্লা রায়। তিনি বারবার বিলাপ করে বলতে থাকেন, “আমার অক্ষরকে একবার আমার কোলে দাও… আমার বাবাকে একটু আমার কোলে দাও…”। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বোন শীর্ষা রায়ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বড় ভাইকে ডাকতে থাকেন। উপস্থিত স্বজনরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও শোকের ভার সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরিবার সূত্রে জানা যায়, তিন ভাই-বোনের মধ্যে অক্ষর ছিলেন সবার বড়। বাবা শেখর রায় করোনাকালে মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে এসে পড়ে। বর্তমানে মা, ছোট বোন, দাদু ও দিদিমাকে নিয়ে খুলনার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন তারা।
স্বজন অপু সিংহ জানান, অক্ষর ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। খুলনা জিলা স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা শেষে ভারতের গুজরাটে প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে ঢাকার বনানীতে একটি শিক্ষা ও মাইগ্রেশন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বিজ্ঞাপন
পরিবারের সদস্যরা জানান, অক্ষরের বিয়ে হয়নি। নিজের ভবিষ্যতের পাশাপাশি পরিবারের অবস্থাও গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

জানা গেছে, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এমনকি প্যারাসেইলিংয়ে ওঠার সময়ও বড় বোন মেধা মৃত্তিকা রায় তাকে এ ধরনের রোমাঞ্চকর কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। তবে সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেই তিনি প্যারাসেইলিংয়ে অংশ নেন।
গত শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। অক্ষরসহ নয়জন বন্ধু ও সহকর্মী সেখানে বেড়াতে যান। প্যারাসেইলিংয়ের জন্য টিকিট কেটে আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণ পর প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট উচ্চতা থেকে তিনি সাগরে পড়ে যান। পরে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিজ্ঞাপন
দুর্ঘটনার পর থেকে পরিবারটির মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্যারাসেইলিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। এছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও উদ্ধার ব্যবস্থা ছিল না বলেও দাবি করেছেন তারা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও দেখা গেছে, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে এমন নিরাপত্তাহীনতা কীভাবে ছিল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
এ ঘটনায় প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছে অক্ষরের পরিবার। পাশাপাশি মরদেহ খুলনায় আনতেও প্রশাসনিক বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
অক্ষরের ভগ্নিপতি বলেন, এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বয়ে বেড়াতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে অক্ষরের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিও জানান।
বিজ্ঞাপন
শেষবারের মতো প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে দুপুরের দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রূপসা মহাশ্মশানে। লাশবাহী গাড়িটি বাড়ির গলি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও স্বজনদের কান্না থামেনি। একমাত্র সন্তানের জন্য মায়ের আকুতি আর পরিবারের আহাজারি উপস্থিত সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।








