Logo

‘আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে,মা-বাবার কবরটুকুও রক্ষা করতে পারিনি’

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বাগেরহাট
১ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৫৩
‘আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে,মা-বাবার কবরটুকুও রক্ষা করতে পারিনি’
ছবি: সংগৃহীত

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার উপকূল ঘেঁষে বয়ে চলেছে বলেশ্বর নদী। একসময় এই নদী ছিল এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নদীই বহু মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে দুঃসহ আতঙ্কের নাম। নদীভাঙনে বসতভিটা, কৃষিজমি, পুকুর, গবাদিপশু থেকে শুরু করে প্রিয়জনের কবর পর্যন্ত হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অসংখ্য পরিবার। তাদেরই একজন উপজেলার বগী বন্দরের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী আক্কাস মিয়া।

বিজ্ঞাপন

স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে প্রায় ছয় দশক ধরে বলেশ্বর নদীর তীরেই বসবাস করছেন তিনি। একসময় তার ছিল ফসলি জমি, মাছে ভরা পুকুর, গোলাভরা ধান এবং গোয়ালভরা গরু। কিন্তু নদী শাসনের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় প্রায় তিন দশক আগে বলেশ্বর নদীর ভাঙনে একে একে হারিয়ে গেছে তার সব সম্পদ।

নিজের জীবনের বেদনার কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে আক্কাস মিয়া বলেন, এই নদী আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। মা-বাবার কবরটুকুও রক্ষা করতে পারিনি এই স্রোতবাহী নদীর কবল থেকে। এখন বেড়িবাঁধের পাশেই থাকি। বেড়িবাঁধও তেমন টেকসই না।

তিনি বলেন, আতঙ্কে থাকি সবসময়- কখন যেন আবার সেই আইলা-সিডরের মতো বড় ঝড় আসে। কত সরকার গেল, কত সরকার এলো, সবাই শুধু কথা দেয় আমাদের পরিবর্তন করবে, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ আর ফিরে তাকায় না। আমরা চাই একটু বাঁচতে। এই নদীটারে যদি একটু শাসন করা যেত, তাহলে একটু ঘুমাতে পারতাম।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

উপকূলীয় মানুষের কাছে গত চার দশক ধরে ঘূর্ণিঝড় এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেননি তারা। প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের প্রায় ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস, প্রাণহানি এবং ঘরবাড়ি হারানোর বিভীষিকা এখনও তাদের তাড়া করে ফেরে।

পুরোনো সেই দুর্যোগের ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন করে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ভাঙন। শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ এলাকায় নির্মিত টেকসই বেড়িবাঁধ হস্তান্তরের তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ফাটল, ব্লক ধস এবং ওপরের অংশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বেড়িবাঁধ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বলেশ্বর নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।

বিজ্ঞাপন

উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মোরেলগঞ্জ থেকে শরণখোলা উপজেলার বগী-গাবতলা পর্যন্ত ৩৫/১ পোল্ডারের প্রায় ৬২ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ড বাগেরহাটের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিরোজপুর, বাগেরহাট ও বরগুনা জেলার একটি নদী বলেশ্বর। এর দৈর্ঘ্য ১৪৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১ হাজার ৬৪৪ মিটার। এক সময় এই নদী ছিল এলাকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। এখন এই নদীই হয়ে উঠেছে মানুষের সর্বনাশের কারণ। সর্বহারা হয়েছে শত শত মানুষ।

মোরেলগঞ্জের ফাঁসিয়াতলা, বড়তলা, সন্ন্যাসী এবং শরণখোলার বগী, গাবতলা, সাউথখালীসহ কয়েকটি স্থান ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বাঁধসংলগ্ন এলাকাবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। দ্রুত নদী শাসন করে বাঁধ রক্ষার দাবি জানান এলাকাবাসী।

বিজ্ঞাপন

সাউথখালীর জেলে নুর ইসলাম হোসেন বলেন, সিডরের দিনের কথা এখনো চোখে ভাসে। মনে হতেই বুক কেঁপে ওঠে। আবার এখন বাঁধে ফাটল ধরেছে, ভয়ে রাতে ঘুম হয় না। এই বাঁধ ভেঙে গেলে আমাদের পুরো গ্রাম জলের তলে চলে যাবে।

সন্ন্যাসী এলাকার রোকেয়া বেগম বলেন, আমরা যে কী অবস্থার ভেতরে রয়েছি, আমরাই ভালো জানি। আমরা চাই আল্লাহ আমাদের ওপর রহমত করুক, আর যেন এই বাঁধ না ভাঙে। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, আমাদের এই বাঁধের দিকে যেন লক্ষ রাখেন, যাতে আমরা বাচ্চাকাচ্চা ও সংসার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারি।

একই এলাকার চল্লিশোর্ধ্ব বয়সী আমেনা বেগম বলেন, রাত্রে আমরা ঘুমাই না, ঘুমাইলে ভাঙনের শব্দ আয়। এরপর বড় বড় একটা বুলাক, চাহা এইগুলো পড়তে আছে। একভাবে পড়তে থাকে, আমাদের তো বাচ্চাগুলো লইয়া ঘুম হয় না। এখানে আমরা নৌকাও রাখতে পারি না, তুফানে বাড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলায়। সরকার যদি আমাগো একটু সাহায্য করতো, বা এই জায়গায় যদি একটু ব্লক দিতো, তাহলে এগুলো ভাঙতো না।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাগেরহাট উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার ফাঁসিয়াতলাসহ কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ধসে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD