Logo

তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটে দক্ষিণাঞ্চলের নৌযোগাযোগ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
বাউফল, পটুয়াখালী
২ আগস্ট, ২০২৬, ১৭:১৮
তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটে দক্ষিণাঞ্চলের নৌযোগাযোগ
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ তেতুলিয়া নদীতে দিন দিন নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত এবং জনজীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

নদীর বিভিন্ন স্থানে চর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট এবং ঢাকা-কালাইয়া ও কালাইয়া-লালমোহন নৌরুটের স্বাভাবিক কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়েছে।

একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল তেতুলিয়া নদী। নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাত্রী পরিবহনকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদগুলো এখন নাব্যতা সংকটের কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক ও জেলেরা জানান, নদীর তলদেশে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পণ্যবাহী কার্গো ও ট্রলার নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। অনেক সময় ডুবোচরে ধাক্কা লেগে নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নাজিরপুর থেকে লালমোহনগামী ট্রলারগুলোকে বর্ষা মৌসুমেও নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে সময় ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের দুর্ভোগও বেড়েছে।

ঢাকা-কালাইয়া নৌরুটে চলাচলকারী লঞ্চ সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীর বিভিন্ন স্থানে পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় নিরাপদে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

নাব্যতা সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি নৌঘাটে পড়েছে। গোলাচিপা, দশমিনা, কালাইয়া, নিমদী, নুরাইপুর ও কালিশুরীসহ একাধিক ঘাটে দ্বিতল লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কালাইয়া থেকে ঢাকাগামী মাত্র একটি দ্বিতল লঞ্চ চলাচল করছে।

বিজ্ঞাপন

ওই লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার মো. হানিফ বলেন, একসময় এ নৌরুটে অসংখ্য স্টেশন ছিল। কিন্তু নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যাত্রীসংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একাধিকবার পরিদর্শন করলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নদীতে ড্রেজিং করলেও যেখানে নাব্যতা সংকট সবচেয়ে বেশি, সেখানে প্রয়োজনীয় খনন হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে ভিটা ভরাটের জন্য বালু সরবরাহে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা ড্রেজিংয়ের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে বলে তাদের দাবি।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রো সলিউশন বিভাগের প্রকৌশলী তানভীর মজুমদার। তিনি বলেন, সরকারি বিধি অনুসরণ করেই আবেদন যাচাইয়ের মাধ্যমে বালু সরবরাহ করা হয় এবং এর জন্য কোনো অর্থ নেওয়া হয় না।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদী খনন করা হলে তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। এতে কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট, চন্দ্রদ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্বাভাবিক যোগাযোগ ফিরবে, ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল হবে এবং জেলেরাও নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারবেন।

এদিকে বাউফল উপজেলার সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক, সেতু ও আবাসন নির্মাণে ভিটা বালুর চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে অনেক উন্নয়নকাজও ধীরগতিতে চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে কালাইয়া বন্দর ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক, জেলে ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, পরিবেশগত ভারসাম্য ও আইনগত বিধান মেনে জরুরি ভিত্তিতে তেতুলিয়া নদীতে কার্যকর ড্রেজিং পরিচালনা করা হোক। তাদের বিশ্বাস, নদীর নাব্যতা ফিরে এলে দক্ষিণাঞ্চলের নৌযোগাযোগ, অর্থনীতি ও জনজীবন আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD