তিস্তায় বালু লুট, ভাঙন ঠেকানোর বাঁধই এখন ঝুঁকিতে

তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নদীতীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। নদীতীরে বসানো হয়েছে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব। কিন্তু সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছেই তিস্তার তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন বসিয়ে দিন-রাত চলছে বালু তোলার কাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে একটি চক্র নদী থেকে বালু তুলে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছে।
ঘটনাটি ঘটছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধসংলগ্ন তিস্তা নদীতে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে সেখানে গভীরতা সৃষ্টি হয়ে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে নদীতীরের ভাঙন আরও তীব্র হয়ে আবাদি জমি, বসতভিটা এবং সরকারি প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
গত শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধের প্রায় ২০০ ফুট পশ্চিমে বটতলী এলাকায় তিস্তা নদীতে একটি সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন বসানো হয়েছে। মেশিনের সঙ্গে পাইপ সংযোগ করে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনে বালু তোলার পাশাপাশি রাতেও মেশিন চালানো হয়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের অভিযোগ, বসতভিটা উঁচু করার কথা বলে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলেও পরে সেই বালু বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম ভাকু ও তাঁর লোকজন রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে প্রভাব খাটিয়ে বালু উত্তোলন করছেন বলেও অভিযোগ তাঁদের।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে রবিউল ইসলাম ভাকু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ভাঙনের ফলে নদের মধ্যে আমাদেরও অনেক জমি আছে। সেই জমি ভরাট হওয়ায় সেখান থেকে বালু উত্তোলন করছি।’
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের দাবি, উত্তোলন করা বালু বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁরা একাধিকবার বালু উত্তোলন বন্ধ করতে অনুরোধ করলেও কাজ বন্ধ হয়নি।
তিস্তার ভাঙনে ছোটখাতা গ্রামের অনেক কৃষক ইতোমধ্যে আবাদি জমি হারিয়েছেন। চলতি বন্যায় কৃষক রহিজ উদ্দিনের প্রায় ২৫ শতাংশ জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
রহিজ উদ্দিন বলেন, ‘এখন ৫০ শতাংশ আবাদি জমি রয়েছে। এভাবে বালু উত্তোলন করা হলে একসময় আমাদের আবাদি জমি হয়তো আর থাকবে না।’
বিজ্ঞাপন
একই এলাকার কৃষক গেদা মাহমুদের ৩৫ শতাংশ আবাদি জমিও নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। তাঁর দাবি, এখন তাঁর বসতভিটাও হুমকির মুখে। আরও কয়েকজন কৃষকও তাঁদের আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল, লিয়াকত হোসেন ও বেল্লাল বলেন, ‘নদীভাঙনে মানুষ এমনিতেই জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছে। এর মধ্যে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়বে। ব্যক্তি মুনাফার জন্য নদী ও পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে।’
নদীতীরবর্তী গ্রাম, বসতভিটা ও আবাদি জমি রক্ষায় ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপন করে তিস্তার ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছাকাছি নদীর তলদেশ থেকেই বালু উত্তোলন চলায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁদের প্রশ্ন, একদিকে সরকারি অর্থ ব্যয় করে নদীভাঙন ঠেকাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে তার পাশেই নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হলে এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা টেকসই হবে?
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে গভীরতা সৃষ্টি হলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে বাঁধ ও নদীতীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে ভাঙন আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ভাঙনের আশঙ্কা থাকলে কিংবা নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ ও স্থলজ প্রাণী, ফসলি জমি বা উদ্ভিদের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সেখান থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন, সেচ বা নদীভাঙন রোধে নির্মিত অবকাঠামোর সংলগ্ন এলাকা থেকেও বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাঁধ, সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, সড়ক, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা আবাসিক এলাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে—এমন স্থান থেকেও বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করা হচ্ছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘তিস্তা নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হবে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিজ্ঞাপন
নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয়দের দাবি, তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধ ও নদীতীর রক্ষায় দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।








