Logo

৫৯ বছরে অনার্স পাস, বয়সকে হার মানালেন বেলায়েত শেখ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শ্রীপুর, গাজীপুর
৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১৫:০২
৫৯ বছরে অনার্স পাস, বয়সকে হার মানালেন বেলায়েত শেখ
ছবি: সংগৃহীত

জীবনের যে সময়ে অনেকেই পড়াশোনার পর্ব শেষ করে অবসর জীবনের দিকে এগিয়ে যান, সেই বয়সেই নতুন করে শিক্ষার পথে পা রেখেছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বেলায়েত শেখ। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, বয়সের ভার কিংবা নানা প্রতিকূলতা—কোনোটিই তাঁকে থামাতে পারেনি। ৫০ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে শুরু করা সেই অসম্ভব মনে হওয়া পথচলার পর ৫৯ বছর বয়সে এসে অর্জন করেছেন অনার্স ডিগ্রি।

বিজ্ঞাপন

বেলায়েত শেখ স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ থেকে অনার্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁর এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বয়সকে পেছনে ফেলে শিক্ষার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, দীর্ঘ সময় পড়াশোনার বাইরে থাকার পর ২০১৭ সালে নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন বেলায়েত শেখ। তখন তাঁর বয়স ৫০ বছর। সেই বয়সে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্তটি অনেকের কাছেই ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু বেলায়েত শেখের কাছে বয়সের চেয়ে বড় ছিল শিক্ষাজীবন শেষ করার অপূর্ণ স্বপ্ন।

তিনি ঢাকার দারুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখানে নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করেন এবং অধ্যবসায়ের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যান। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন তিনি।

বিজ্ঞাপন

এসএসসি পাসের পরও থেমে যাননি বেলায়েত। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনায় ভর্তি হয়ে একইভাবে চালিয়ে যান তাঁর শিক্ষা কার্যক্রম। দুই বছর পর, ২০২১ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।

এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয় বেলায়েত শেখের। বয়সের কারণে পিছিয়ে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা শুরু করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান বেলায়েত শেখ। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বেলায়েত শেখকে মোকাবিলা করতে হয়েছে ভিন্ন ধরনের বাস্তবতার। তাঁর অধিকাংশ সহপাঠী ছিলেন বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক ছোট। তবে বয়সের বড় ব্যবধানকে কখনো নিজের দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি তিনি।

তরুণ সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস করেছেন, পড়াশোনা করেছেন, অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করেছেন এবং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। বয়সের পার্থক্য থাকলেও শিক্ষার ক্ষেত্রে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেখেননি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁকে সামলাতে হয়েছে পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ সামনে এলেও নিজের লক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়াননি। ধৈর্য, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একের পর এক ধাপ অতিক্রম করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নতুন করে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর প্রায় নয় বছরের শিক্ষাযাত্রা শেষে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেছেন বেলায়েত শেখ। ৫৯ বছর বয়সে স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ থেকে অনার্স পাস করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

এই অর্জন শুধু একটি একাডেমিক ডিগ্রি পাওয়ার ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন পরও স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বয়সকে বাধা হিসেবে না দেখে শিক্ষার প্রতি নিজের আগ্রহ ধরে রেখে কীভাবে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, বেলায়েতের যাত্রা তারই উদাহরণ।

তাঁর এই সাফল্য বিশেষ করে তাদের জন্য অনুপ্রেরণার, যারা বয়স বা দীর্ঘ বিরতির কারণে আবার পড়াশোনা শুরু করার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

অনার্স পাসের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বেলায়েত শেখ বলেন, শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। জীবনে নানা প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য স্থির রেখে চেষ্টা ও পরিশ্রম চালিয়ে গেলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বয়সের কারণে যারা পড়াশোনা থেকে দূরে রয়েছেন, তাঁদের হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সুযোগ পেলে আবারও শিক্ষার পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বেলায়েতের মতে, মানুষের জীবনে সময় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের ইচ্ছা ও মানসিক দৃঢ়তাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বপ্ন পূরণের জন্য বয়সকে অজুহাত না বানিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যাওয়া উচিত।

বেলায়েত শেখের এই সাফল্যে তাঁর পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের ব্যতিক্রমী পথচলার কথা জানার পর অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

৫০ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে ৫৯ বছর বয়সে অনার্স ডিগ্রি অর্জন—পুরো পথটিই ছিল নানা চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। কিন্তু কোনো পর্যায়েই নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি তিনি।

বেলায়েত শেখের গল্প তাই কেবল একজন বয়স্ক শিক্ষার্থীর ডিগ্রি অর্জনের ঘটনা নয়। এটি স্বপ্ন, ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের একটি বাস্তব উদাহরণ। তাঁর জীবন দেখিয়ে দিয়েছে, বয়স বাড়লেও শেখার আগ্রহ হারিয়ে না ফেললে নতুন করে শুরু করার সুযোগ কখনো শেষ হয়ে যায় না।

সময় পেরিয়ে গেলেও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার বার্তাই দিয়েছেন বেলায়েত শেখ। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে—স্বপ্ন পূরণের পথে বয়স নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD