বাগাতিপাড়ার ৩০০ বছরের মসজিদটি হারাচ্ছে ইতিহাসের স্মৃতি

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার চকমাহাপুর গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ‘আবদালের মসজিদ’। স্থানীয়ভাবে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো হিসেবে পরিচিত এই মসজিদটি একসময় ছিল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় ইতিহাস, জনশ্রুতি ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, বাগাতিপাড়া অঞ্চলের মধ্য দিয়ে একসময় পদ্মা নদীর শাখা বড়াল থেকে উৎপন্ন একটি নদী প্রবাহিত হতো। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা ধরনের কারুশিল্প। নদীপথের কারণে এ অঞ্চল একসময় বেশ কর্মচঞ্চল ছিল।
সেই সময় বাগাতিপাড়া এলাকায় প্রচুর পরিমাণে ঝিনুক ও শামুক পাওয়া যেত। এসব ঝিনুক-শামুক আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করা হতো চুন। প্রাচীন বাংলায় বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণকাজে চুনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। দেয়ালের গাঁথুনি, প্লাস্টার এবং স্থাপনার সৌন্দর্যবর্ধনেও চুন ব্যবহার করা হতো। ফলে ঝিনুক ও শামুক থেকে চুন তৈরির কাজকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প গড়ে ওঠে।
এই চুন তৈরির পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল ‘আবদাল’ নামে পরিচিত একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী। স্থানীয় ইতিহাস-গবেষকদের মতে, আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষের প্রধান পেশার মধ্যে চুন উৎপাদন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ অন্যতম ছিল। পেশাকে কেন্দ্র করে তারা নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসতি গড়ে তুলেছিলেন।
বিজ্ঞাপন
বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা সাবেক উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন শতাব্দী আগে চকমাহাপুর গ্রামের নদীর তীরে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন মসজিদটি নির্মাণ করেন। সেই থেকে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিত হয়ে আসছে।
তবে মসজিদটি ঠিক কোন বছরে কিংবা কোন শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল বা সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এর প্রকৃত নির্মাণকাল নির্ধারণে আরও গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন ইতিহাস-সচেতন ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের মতে, মসজিদটির নির্মাণশৈলীও এর প্রাচীনত্বের ইঙ্গিত বহন করে। গ্রামীণ পরিবেশে কয়েক শতাব্দী আগে নির্মিত এই স্থাপনার সঙ্গে শুধু ধর্মীয় ইতিহাস নয়, বরং বাগাতিপাড়ার নদীকেন্দ্রিক জীবন, স্থানীয় অর্থনীতি, চুনশিল্প এবং আবদাল সম্প্রদায়ের পেশা ও জীবনযাত্রার ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় বাগাতিপাড়ার ভূপ্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রা। একসময় যে নদীকে কেন্দ্র করে জনপদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছিল, সেটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন নদী, খাল-বিল ভরাট হতে থাকায় কমে যায় ঝিনুক ও শামুকের প্রাপ্যতাও।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
একপর্যায়ে ঝিনুক-শামুক পুড়িয়ে চুন তৈরির ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। চুনশিল্পের সঙ্গে জীবিকা জড়িত থাকা আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষও ধীরে ধীরে তাদের পুরোনো পেশা ছেড়ে দেন। জীবিকার তাগিদে অনেকে অন্যত্র চলে যান কিংবা ভিন্ন পেশায় যুক্ত হন।
বিজ্ঞাপন
এর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে থাকে আবদাল সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সামাজিক উপস্থিতিও। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে তাদের নির্মিত ঐতিহাসিক মসজিদটির ওপর।
দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় স্থাপনাটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত অবস্থায় চলে যায়। বর্তমানে মসজিদের চারপাশে আগাছা ও জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে। অনেকটা আড়ালে পড়ে থাকা স্থাপনাটি এখন স্থানীয় মানুষের কাছেও আগের মতো দৃশ্যমান নয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও এটি সংরক্ষণের জন্য এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় প্রাচীন এই স্থাপনার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সংরক্ষণের আগে ‘আবদালের মসজিদ’-এর প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান করা জরুরি। এর নির্মাণকাল, নির্মাণকৌশল, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং আবদাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে গবেষণা প্রয়োজন।
তাদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যাচাই করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থাপনাটির সীমানা নির্ধারণ, আশপাশের আগাছা পরিষ্কার, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
স্থানীয় ইতিহাসসচেতন মানুষের মতে, ‘আবদালের মসজিদ’কে শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে বাগাতিপাড়ার প্রাচীন নদীকেন্দ্রিক জনবসতি, চুনশিল্প, স্থানীয় অর্থনীতি এবং বর্তমানে প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়ের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তাদের দাবি, দ্রুত মসজিদটি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করে এর প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে স্থাপনাটিকে রক্ষা করা হলে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাগাতিপাড়ার অতীত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যথায় দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় থাকা প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটিও ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে চলে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে বাগাতিপাড়ার নদী, চুনশিল্প ও আবদাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।








