আমি কখনো চাইনি আমার বাচ্চা ফার্মের মুরগির মতো বড় হোক

সন্তানকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি রেখে নয়, বরং পৃথিবীর আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা একজন আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার পথই যে একদিন বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা কখনো ভাবেননি। একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হারানোর পর নিজের সন্তান প্রতিপালনের ভাবনা ও স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিজ বাসায় নিহত অপ্রতিমের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় নিজের সন্তানকে বেড়ে তোলার ভাবনা তুলে ধরে ড. নাহিদা বলেন, ‘আমি কখনো চাইনি আমার বাচ্চা ফার্মের মুরগির মতো বড় হোক। একটা বাক্সের মধ্যে বড় হোক, বাইরে বের হবে, আবার বাক্সে ঢুকে যাবে—এটা আমি চাইনি।’
অপ্রতিমকে প্রচলিত ধারণার চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী বানানোর কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না জানিয়ে ড. নাহিদা বলেন, তার চাওয়া ছিল ছেলে যেন দেশ-বিদেশ ঘুরে বিশ্বকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করতে শেখে এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে পারে। পড়াশোনার পাশাপাশি অপ্রতিমকে বহুবিধ দক্ষতায় দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তাকে ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতার শেখানো হয়েছিল, দেওয়া হয়েছিল কারাতের প্রশিক্ষণও। এমনকি এক বছর নাচ শিখেছিল সে, যার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ঘরে এখনো তার ব্যবহৃত হারমোনিয়ামটি রয়েছে।আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ছেলের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার স্বপ্ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি চেয়েছি আমার ছেলে প্রত্যেকটা কাজে সেলফ ডিপেন্ডেন্ট হবে। কোন সবজি কোনটা, কোন পেশা কোনটা—সে নিজে নিজে চিনুক। আমি চেয়েছি আমার ছেলে সারা দুনিয়া ঘুরে ঘুরে পৃথিবীকে চিনুক।’
সন্তানের মেলামেশা ও স্বভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে ড. নাহিদা জানান, অপ্রতিম মানুষকে খুব দ্রুত আপন করে নিতে পারত। বয়সের ব্যবধান বা সিনিয়র-জুনিয়র বিচার করত না। শৈশব থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী তাকে স্নেহ করতেন এবং কোলে তুলে নিতেন। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবাইকে সে পরম নির্ভরতায় ‘ভাইয়া’ বলে সম্বোধন করত।
বিজ্ঞাপন
নিজের সন্তান প্রতিপালন পদ্ধতি (প্যারেন্টিং) নিয়ে আত্মোপলব্ধি প্রকাশ করে এই শিক্ষক বলেন, ‘এটা আমার ভুল হতে পারে। আমার এই প্যারেন্টিং যদি ভুল হয়, আমি মাফ চাই।’
তবে নিজের এই উপলব্ধির পাশাপাশি অন্য অভিভাবকদের জন্যও সতর্ক হওয়ার বার্তা দিয়েছেন ড. নাহিদা। তার মতে, সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সে কার সঙ্গে চলাফেরা করছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়েও অভিভাবকদের বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন।
অপ্রতিমকে হারানোর শোকের মধ্যেই নিজের সন্তানকে ঘিরে দেখা স্বপ্ন ও সন্তান প্রতিপালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অন্য অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তার মা।
বিজ্ঞাপন








