সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার পাড়ি দিলো কালজয়ী বাঁশের ভুঁড়

খরস্রোতা পদ্মার বুকে একের পর এক ভেসে চলছে বিশাল বিশাল বাঁশের ভেলা। কোনো ভেলায় মাইকে ধ্বনিত হচ্ছে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জিকির, কোথাও চলছে রান্নার আয়োজন। কোনো ভেলায় নামাজের প্রস্তুতি, আবার কোথাও গজলের সুরে সুরে চলছে দাঁড় টানা। রঙিন কাপড় ও বাহারি বাতিতে সাজানো কোনো কোনো ভেলায় নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন গেট। উত্তাল নদীর বুকে এমন দৃশ্য যেন এক ব্যতিক্রমী ভাসমান জনপদ।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা নদীতে দেখা মেলে এমন অসংখ্য বাঁশের ভেলার কাফেলার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসব ভেলা দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে ছুটে যায় আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দরবার শরীফের উদ্দেশে। নদীর বুকে ভাসমান এই কাফেলা শুধু একটি যাত্রার দৃশ্য নয়, বরং বহু বছরের একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও বহিঃপ্রকাশ।
নদীপথে চলার সময় ভেলার ওপরই চলে খাবার রান্না, গোসল, নামাজ, বন্দেগি ও জিকির-আজকার। রাত-দিন পালা করে দাঁড় টেনে এগিয়ে চলে ভেলার কাফেলা। পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদী পেরিয়ে ছোট ছোট খাল ধরে এসব বাঁশের ভেলা সদরপুর উপজেলার আটরশি দরবার শরীফে পৌঁছায়।
ভেলায় বহন করে আনা বাঁশগুলো পরবর্তী সময়ে আটরশির উরস শরীফে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব বাঁশ দিয়ে কোটি কোটি মানুষের রান্নার জ্বালানি, সুবিশাল গেট, জাকেরানদের থাকার প্যান্ডেল, অজুখানা এবং পয়োনিষ্কাশনের জন্য অস্থায়ী বাথরুমসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫২ বছর ধরে প্রতিবছর দেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আটরশি দরবারের ভক্তরা বাঁশের ভেলা নিয়ে দীর্ঘ নদীপথে যাত্রা করেন। করতোয়া, যমুনা, পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁসহ ছোট-বড় বেশ কয়েকটি নদ-নদী পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান আটরশি দরবার শরীফে।
আটরশির কালজয়ী ঐতিহ্য বাঁশের ভুঁড়
আটরশির দরবারকে ঘিরে উত্তরবঙ্গের জাকেরান ও আশেকানদের এই বাঁশের ভেলা পাঠানোর রীতিকে একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়। নদীর বুকে কুয়াশার চাদর আর ভোরের আলো-আঁধারির মধ্যে যখন ভেলার কাফেলা এগিয়ে যায়, তখন চারপাশে ভেসে আসে আল্লাহর জিকিরের ধ্বনি। ভক্তদের কাছে এটি ভালোবাসা, ভক্তি ও উৎসর্গের প্রতীক।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
আটরশির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় চেতনা বিস্তারের নানা কাহিনি। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলা ১৩৫৪ সনে সেই অঞ্চলে পা রাখেন মাওলানা শাহ্সূফী খাজাবাবা ফরিদপুরী। তৎকালীন শেরপুরের পাকুরিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই সাধক ছিলেন মাওলানা শাহ্সূফী খাজা এনায়েতপুরীর অন্যতম প্রধান খলিফা।
বর্ণনা অনুযায়ী, এক ঈদের দিনে মাত্র তিন-চারজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে খাজাবাবা সেখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি দয়াল নবীজির উম্মতদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। তার সেই দোয়ার মধ্য দিয়ে আটরশিতে একদিন বড় ঈদের জামাত হবে—এমন আকাঙ্ক্ষার কথাও প্রচলিত রয়েছে।
পরবর্তীতে একটি ছোট ছনের ঘর থেকে শুরু হয় হেদায়েতের আলো ছড়ানোর কাজ। এক বছর পর মাত্র আট টাকায় কেনা ছনের ছাউনি ও সুপারি গাছের খোলের বেড়া দিয়ে তৈরি সেই ছোট ঘরটির নাম দেওয়া হয় ‘জাকের ক্যাম্প’। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট ঘরই পরিণত হয় বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে।
বিজ্ঞাপন
যেভাবে শুরু বাঁশের ভেলার যাত্রা
দরবারের এই অনন্য রীতির সঙ্গে ১৯৭৫ সাল থেকে বাঁশের ভেলা পাঠানোর ইতিহাস জড়িয়ে আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। খাজাবাবার নির্দেশে বিশিষ্ট জাকের তসলিম উদ্দিন প্রধান, নুরু মাস্টার, আবু সালেহ ও আকবর আলীর নেতৃত্বে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর থানার অনন্তপুর ইউনিয়নের ধরণীবাড়ি, বনগাঁ ও বজরা গ্রাম থেকে প্রথম এই নজরানার বাঁশ কাটা শুরু হয়।
প্রথম পাঁচ থেকে সাত বছর ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে ভেলা ছাড়া হলেও পরে স্থায়ীভাবে চিলমারী ঘাট থেকে এই মহাযাত্রা শুরু হয়। সেই রীতি এখনো চলমান রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলা আশ্বিন মাসের প্রথম বুধবারের ঊষালগ্নে বিদায়ী মাহফিল ও অশ্রুসিক্ত মোনাজাতের মধ্য দিয়ে প্রায় ২০০টি সুসজ্জিত একক নজরানা যাত্রা শুরু করে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা হয়ে পদ্মা পেরিয়ে দীর্ঘ নদীপথে এগিয়ে যায় এসব ভেলা।
দীর্ঘ এই যাত্রায় ঝড়-বৃষ্টি, প্রবল স্রোতসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ভেলাগুলো যখন আটরশির মাটিতে পৌঁছায়, তখন ভক্তদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি পূর্ণতা পায়। কোনো কোনো ভেলা আটরশিতে পৌঁছাতে আট থেকে ১০ দিন সময় নেয়। আবার কোনো কোনো জেলার ভেলা পৌঁছাতে ১০ থেকে ২০ দিনও লেগে যায়।
এই দীর্ঘ যাত্রায় দিন-রাতের হিসাব যেন থাকে না। ভেলা ও নদীর ঢেউয়ের তালে তালে আশেকানদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে আল্লাহর জিকির। একই সঙ্গে ভেলার ওপর চলে গজল, নামাজ, রান্না, গোসল ও বন্দেগি।
বিজ্ঞাপন
এক ভেলায় থাকে প্রায় ৩ হাজার বাঁশ
ভেলায় আগত জাকেরান-আশেকানদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর উরস শরীফ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী বছরের উরসের জন্য বাঁশ সংগ্রহ করা হয়। বর্ষা মৌসুম এলে সেসব বাঁশ একত্র করে তৈরি করা হয় বিশাল ভেলা।
চিলমারীর ভক্ত রোকনুজ্জামান বলেন, একেকটি বাঁশের ভেলায় প্রায় তিন হাজার বাঁশ থাকে। নদীর পাড়ে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে দলবদ্ধভাবে তারা যাত্রা শুরু করেন। একেকটি ভেলায় ৪০ থেকে ৫০ জন কর্মী দাঁড় টানার কাজে থাকেন। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পালা করে তারা দাঁড় টানেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, খাবার, গোসল, নামাজ, বন্দেগি, জিকির-আজকার—সবকিছুই ভেলার ওপর চলে। প্রতিবছরই তিনি এই যাত্রায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও জানান।
দীর্ঘ নদীপথে বিভিন্ন জেলার স্থানীয় জাকেররা ট্রলার নিয়ে ভেলাগুলোর পাশে থাকেন। খাবার, চিকিৎসা ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও নদীপথে করা হয়। কখনো প্রবল স্রোতে কোনো ভেলা এলোমেলো হয়ে গেলে ট্রলারের মাধ্যমে ভেলায় থাকা লোকজনকে উদ্ধার করে আবার নদীর গতিপথে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ভেলায় ভেসে আসে ঐতিহ্যের দৃশ্য
বিজ্ঞাপন
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সাজানো-গোছানো বাঁশের ভেলার সারি পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদী পেরিয়ে স্থানীয় মানুষের বাড়িঘরের সামনে দিয়ে যায়। নদীর বুকে ভাসমান এসব ভেলা দেখতে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন স্থানীয়রাও।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব মানুষকে দিনের পর দিন নদীপথে ভ্রমণ করতে হয়। তাদের সঙ্গে অনেক বয়স্ক মানুষও থাকেন। দীর্ঘ যাত্রায় শরীরে ক্লান্তি থাকলেও আটরশি দরবারের সীমানায় পৌঁছানোর সময় তাদের চোখেমুখে আনন্দের ছাপ দেখা যায়।
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁসহ বিভিন্ন নদ-নদীর স্রোত পেরিয়ে বাঁশের ভেলার এই কাফেলা প্রতিবছর আটরশির পথে যাত্রা করে। দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ দিনের এই কঠিন যাত্রায় ভেলার ওপরই চলে জিকির, গজল, নামাজ, রান্না ও পথচলা।
বিজ্ঞাপন
বহু বছর ধরে চলে আসা এই ভেলা যাত্রা উত্তরাঞ্চলের জাকেরান ও আশেকানদের কাছে বিশ্বাস, ভক্তি ও ঐতিহ্যের একটি বিশেষ প্রতীক হয়ে উঠেছে। নদীপথের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে প্রতিবছর এই ভেলার কাফেলা যেন পুরোনো এক ঐতিহ্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।








