Logo

আটরশির কালজয়ী ঐতিহ্য বাঁশের ভুঁড়ের নজরানা!

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭:০৯
আটরশির কালজয়ী ঐতিহ্য বাঁশের ভুঁড়ের নজরানা!
ছবি: সংগৃহীত

নদীর বুকে কুয়াশার চাদর, আর ভোরের আলো-আঁধারির এক মায়াবী পরিবেশ। চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে, ভেসে আসছে আল্লাহর জিকিরের পবিত্র প্রতিধ্বনি। এটি কেবল কোনো নদীর সাধারণ দৃশ্য নয়। এটি এক পরম ভক্তি, প্রেম আর মহাসাধকের চরণে, উৎসর্গীকৃত হৃদয়ের এক মহাযাত্রা। উত্তরবঙ্গের জাকেরান ও আশেকানদের অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত, এক কালজয়ী ঐতিহ্য ‘আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের উদ্দেশ্যে, পাঠানো বাঁশের ভুঁড়। নদীপথে বয়ে চলা এক অনন্য নজরানা, যা ভালোবাসার এক অদৃশ্য সেতুতে বেঁধেছে, উত্তরবঙ্গ আর ফরিদপুরের পবিত্র মাটিকে।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এক ঐতিহ্যবাহী আটরশিকে। আজ যে ভূমি কোটি মানুষের পুণ্যভূমি, একসময় তা ছিল ইসলামের আলো থেকে যোজন যোজন দূরে। দিনটি ছিল পবিত্র ঈদুল আজহা। কোরবানির আনন্দ যখন বিশ্বজুড়ে, তখন আটরশির মানুষ জানতই না ইসলাম কী। ঈদের সকালে তারা নামাজ ছেড়ে, লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে যেতো। সে অঞ্চলে কোনো নামাজ ছিল না, সমাজ ছিল না। অজ্ঞতার কারণে গরুর গোশতকে এ অঞ্চলের মুসলমানরা অস্পৃশ্য মনে করতো। পার্শ্ববর্তী জমিদারের পূজায় অংশ নেওয়া আর হিন্দুয়ানি রীতিনীতি আঁকড়ে ধরাই ছিল তাদের জীবন। তৎকালীন বাংলায়, আটরশির মতো এমন, ধর্মীয় চেতনাহীন দ্বিতীয় কোনো গ্রাম হয়তো আর ছিল না।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ঠিক এমন একটি অন্ধকার লগ্নে, বাংলা ১৩৫৪ সনে, সেই মাটিতে পা রাখলেন যুগের সূর্য, দয়ার সাগর হযরত মাওলানা শাহ্সূফী খাজাবাবা ফরিদপুরী। তৎকালীন শেরপুরের পাকুরিয়া গ্রামের, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহাসাধক, ছিলেন হযরত মাওলানা শাহ্সূফী, খাজা এনায়েতপুরীর অন্যতম প্রধান খলিফা। সেই ঈদের দিনে, মাত্র তিন-চারজন মানুষকে সাথে নিয়ে খাজাবাবা আদায় করলেন পবিত্র নামাজ। জামাত শেষে, দয়াল নবীজির উম্মতদের হেদায়েতের জন্য, আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কেঁদে কেঁদে দোয়া করলেন “হে খোদা-তাআলা! আজ যে তিন-চারজন মানুষ নিয়ে, আমরা ঈদের নামাজ পড়লাম... দয়া করে তুমি এইখানে একদিন বিশাল ঈদের জামাত কায়েম করো।

এক মহাসাধকের চোখের জল, আর আরশের অধিপতির দয়ায়, আজ সেই আটরশিতে অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসের অন্যতম বিশাল ঈদের জামাত। সত্য তরিকার সেই সূচনাটা ছিল বড়ই ত্যাগের। একটি অতি ক্ষুদ্র ছনের ঘর থেকে শুরু হয়েছিল হেদায়েতের, আলো ছড়ানোর কাজ। এর এক বছর পর, মাত্র আট টাকায় ক্রয় করা ছনের ছাউনি আর সুপারি গাছের খোলের বেড়া দিয়ে তৈরি, সেই ছোট্ট ঘরটির নাম দেওয়া হয়েছিল, 'জাকের ক্যাম্প'। সময়ের আবর্তনে সেই ত্যাগের কুঁড়েঘরই আজ কোটি হৃদয়ের স্পন্দন, পরম পবিত্র 'বিশ্ব জাকের মঞ্জিল'।

এই দরবারের অন্যতম অনন্য রীতি উত্তরবঙ্গের ‘বাঁশের ভুঁড়’। ১৯৭৫ সালে খাজাবাবার হুকুমে, বিশিষ্ট জাকের তসলিম উদ্দিন প্রধান, নুরু মাস্টার, আবু সালেহ ও আকবর আলীর নেতৃত্বে, কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর থানার অনন্তপুর ইউনিয়নে ধরণীবাড়ি, বনগাঁ, বজরা গ্রামে, প্রথম এই নজরানার বাঁশ কাটা, শুরু হয়। প্রথম ৫-৭ বছর, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে ভুঁড় ছাড়া হলেও, পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে, চিলমারী ঘাট থেকে এই মহাযাত্রা শুরু হয়, যা আজও চলমান। বাংলা আশ্বিন মাসের প্রথম বুধবারের ঊষালগ্নে, বিদায়ী মাহফিল ও অশ্রুসিক্ত মোনাজাতের মধ্য দিয়ে, ৯০ থেকে ১০০টি সুসজ্জিত একক নজরানা যাত্রা শুরু করে, প্রমত্তা নদীর বুকে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা হয়ে পদ্মা পেরিয়ে, দীর্ঘ নদীপথের সব ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, এই নজরানা যখন আটরশির পবিত্র মাটিতে পৌঁছায়, তখন পূর্ণতা পায় হাজারো ভক্তের দীর্ঘদিনের সাধনা। দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ দিনের এই কঠিন যাত্রায়, দিন নেই, রাত নেই, ভেলা আর নদীর ঢেউয়ের তালে তালে আশেকানদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, আল্লাহর পবিত্র জিকির। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই অনন্য রীতি-- প্রমাণ করে, মুর্শিদের প্রতি মুরিদের ভালোবাসা কোনো ভৌগোলিক দূরত্ব মানে না, কোনো বাধা মানে না। উত্তরবঙ্গের জাকেরানদের এই ভক্তির ভেলা, যুগে যুগে বেঁচে থাকুক বিশ্বাসের এক অবিচল প্রতীক হয়ে। বিশ্ব ওলী খাজাবাবা ফরিদপুরীর চরণে, জাকেরান ও আশেকানদের কোটি কোটি কদমবুচি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD