উজিরপুর ইউএনও’র আশ্বাসে অনিকের ঘরে নতুন স্বপ্ন

একটি ছোট্ট মেয়ে। বয়স মাত্র নয়। বাবার হাত-পা বাঁধা, চারপাশে মানুষের ভিড়। সেই অসহায় বাবার মুখে নিজের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছে তুবা বিনতে। জানত না, তার ছোট্ট হাতের সেই মুঠো খাবার একদিন হাজারো মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেবে। জানত না, বাবার প্রতি তার নিখাদ ভালোবাসার একটি দৃশ্য বদলে দেবে তাদের পরিবারের জীবন। বাবার হাত-পা বাঁধা। চারপাশে মানুষের ভিড়। আর সেই ভিড়ের মধ্যেই নয় বছরের তুবা বিনতে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার।
বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। মানুষের চোখে জল আনে তুবার ভালোবাসা, আর সেই ভালোবাসার সূত্র ধরেই বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার অনিক সরদারের পরিবারের পরিবারের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে মানুষের সহানুভূতি। কয়েক দিন আগেও যে পরিবারটির দিন কাটত অভাব আর অনিশ্চয়তায়, এখন সেই বাড়ির দরজায় মানুষের আনাগোনা। কেউ আসছেন খোঁজ নিতে, কেউ সহযোগিতার হাত বাড়াতে। এরই মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এসেছে আশার বার্তা।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অনিকের বাড়িতে যান উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। অনিক নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে সরকারি সহায়তায় তাঁর পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন ইউএনও।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মো. আলী সুজা বলেন, “বাবার জন্য মেয়ের ভালোবাসা দেখেছে সারা পৃথিবীর মানুষ। তুবা বিনতের বাবা অনিক সরদার আলোর পথে ফিরলে সরকারিভাবে সহায়তা করে ওই পরিবারের পাশে দাঁড়াব।” এই কয়েকটি কথাই যেন অনিকের পরিবারের কাছে দীর্ঘ অন্ধকারের মধ্যে একটি আলোর রেখা। কারণ তাদের চাওয়া বড় কিছু নয় একটি কাজ, নিয়মিত কিছু আয়, সন্তানদের মুখে খাবার আর একটু স্বস্তির জীবন। অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফিরদাউস এইচএসসি পাস করেছেন। তাঁদের দুই সন্তান তুবা বিনতে (৯) ও তুরিন ইসলাম তুনা (৩)। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই স্বপ্নগুলো বারবার থমকে যায়।
চোখের পানি মুছে জান্নাতুল ফিরদাউস বলেন, “আমরা ভালোভাবে বাঁচতে চাই। সন্তান দুটিকে মানুষ করতে চাই। আমার স্বামী একটি কাজ পেলে, অথবা আমি একটি চাকরি পেলে সংসারটা নতুন করে সাজাতে পারব।” স্বামীর জন্য তাঁর কণ্ঠে যেমন উদ্বেগ, তেমনি আছে নতুন জীবনের প্রত্যাশা। অনিকও এবার অতীতের অন্ধকার পেছনে ফেলে আলোর পথে হাঁটতে চান। তাঁর কণ্ঠে অনুতাপের চেয়ে বেশি শোনা যায় নতুন করে শুরু করার আকুতি। অশ্রুসজল চোখে অনিক বলেন, “আমি ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চাই। কেউ আমাকে আয়-রোজগারের একটা পথ তৈরি করে দিলে আমি নিজেকে পরিবর্তন করব।”
বিজ্ঞাপন
একটি পরিবারের জন্য একটি কাজ কতটা বড় আশীর্বাদ হতে পারে, অনিকের ঘরে গেলে তা বোঝা যায়। সেখানে বিলাসিতার কোনো চাওয়া নেই। নেই বড় কোনো স্বপ্নের তালিকা। আছে শুধু দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা, স্ত্রীকে নিয়ে শান্তিতে সংসার করার ইচ্ছা এবং সমাজের বোঝা না হয়ে নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা। আর এই জায়গাতেই ইউএনও আলী সুজার আশ্বাসটি অনিকের পরিবারের কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে।
কারণ আশ্বাসটি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে সব দরজা এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি। ফিরে আসার পথ এখনও খোলা আছে। তুবার সেই ছোট্ট হাত হয়তো সেদিন শুধু বাবাকে খাবার খাইয়েছিল। কিন্তু সেই হাতই আজ অনিকের পরিবারের সামনে নতুন স্বপ্ন। অনিক সেই সুযোগটিই চান। সে চায় তার নিজের সন্তানদের চোখে আবার নতুন করে একজন ভালো বাবা হয়ে উঠতে।
চান স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। আর পরিবারটির বিশ্বাস, মানুষের সহানুভূতি ও প্রশাসনের সহযোগিতা একসঙ্গে থাকলে সেই স্বপ্ন হয়তো আর স্বপ্ন হয়ে থাকবে না। তুবার চোখে বাবাকে ঘিরে যে ভালোবাসা, জান্নাতুলের চোখে যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর অনিকের কণ্ঠে যে বদলে যাওয়ার আকুতি ইউএনও আলী সুজার আশ্বাসে আজ সেই তিনটি মিলে অনিকের ঘরে জ্বলছে নতুন আশার আলো।
বিজ্ঞাপন
তাদের প্রত্যাশা অতীতের অন্ধকার পেছনে ফেলে অনিক ফিরবেন আলোর পথে, একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন এবং দুই সন্তানকে নিয়ে গড়ে তুলবেন একটি স্বাভাবিক, সুন্দর জীবন। আর সেই আশার আলোকে আরও দৃশ্যমান করেছে প্রশাসনের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ।
ইউএনও মো. আলী সুজার আশ্বাসে অনিকের পরিবার মনে করছে, সুযোগ পেলে মানুষ বদলাতে পারে, ঘুরে দাঁড়াতে পারে। প্রয়োজন শুধু একটি হাত, যে হাতটি তাকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফিরিয়ে আনবে।








