রিকশা চালিয়ে পাঁচ সন্তান মানুষ করেও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঠাঁই নেই সন্তানের ঘরে!

একসময় রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে ঘাম ঝরিয়েছেন দিনের পর দিন। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে মানুষ করেছেন তিন ছেলে ও দুই মেয়েসহ পাঁচ সন্তানকে। ভেবেছিলেন, জীবনের শেষ বেলায় সন্তানদের কাছে পাবেন একটু আশ্রয়, দুবেলা খাবার আর ভালোবাসা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ যেন ধূসর হয়ে গেছে। যাদের মুখে হাসি ফোটাতে সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন, সেই সন্তানদের সংসারে ঠাঁই হয়নি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের।
বিজ্ঞাপন
এখন তাঁদের ঠিকানা আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি জরাজীর্ণ ঘর। আর দুমুঠো খাবারের জোগান দিতে জীবনের শেষ বয়সেও ময়লা-আবর্জনার স্তূপে প্লাস্টিক কুড়িয়ে বেড়ান ৭০ বছর বয়সী কালাম মোল্লা। পাশে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী জরিনা বেগম। নানা রোগে আক্রান্ত নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে তাঁদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
বলছিলাম বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের কৃষ্ণকাঠি গ্রামের বাসিন্দা কালাম মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী জরিনা বেগমের কথা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে একসময় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে খুলনা শহরে বসবাস করতেন কালাম মোল্লা। সেখানে রিকশা চালিয়ে কষ্টের উপার্জনে পাঁচ সন্তানকে বড় করেছেন। সন্তানরা বড় হয়ে নিজেদের মতো সংসার গড়েছেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য মেলেনি সন্তানদের সংসারে স্থায়ী আশ্রয়। নিজের সব সম্পত্তি সন্তানদের দিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন কালাম মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী। একপর্যায়ে ভূমিহীন ও গৃহহীন এই দম্পতির ঠাঁই হয় ভরপাশা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আট নম্বর ঘরে।
বিজ্ঞাপন
সেই ঘরেই এখন কাটছে তাঁদের অসহায় জীবন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। নেই নিয়মিত আয়ের কোনো ব্যবস্থা। জীবন চালাতে প্রতিদিন বাকেরগঞ্জ উপজেলা শহরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থেকে প্লাস্টিক ও পরিত্যক্ত সামগ্রী সংগ্রহ করেন কালাম মোল্লা। সেগুলো বিক্রি করে কখনো ২০০, কখনো ৩০০ টাকা আয় হয়। আর সেই সামান্য অর্থেই চলে দুজনের সংসার।
কালাম মোল্লা বলেন, সারাজীবন কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করেছি। রিকশা চালিয়ে যা আয় করেছি, তা দিয়ে তাদের বড় করেছি। এখন বৃদ্ধ বয়সে শরীর আর আগের মতো চলে না। নানা রোগে ভুগছি, কিন্তু চিকিৎসা করানোর টাকা নেই। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে ময়লা-আবর্জনা থেকে প্লাস্টিক কুড়াই। যা পাই, তা বিক্রি করে কোনো রকমে দুজনের খাবার জোগাড় করি।
তিনি আরও বলেন, নিজের যা কিছু ছিল, সন্তানদের দিয়েছি। এখন আমাদের দেখার কেউ নেই। শেষ বয়সে একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই, কিন্তু সেই সামর্থ্যও নেই।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ইসলামের শিক্ষা ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভিক্ষা না করে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহের আদর্শকে ধারণ করে কালাম মোল্লা কারও কাছে হাত পাততে চান না। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েও পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এই বয়সে প্রতিদিন ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ঘুরে বেড়ানো তাঁর জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ।
বৃদ্ধ এই দম্পতির দাবি, এখন পর্যন্ত তাঁরা কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তা পাননি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর ছাড়া তাঁদের আর কোনো অবলম্বন নেই। চিকিৎসা, খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
বিজ্ঞাপন
জীবনের যে সময়টুকুতে তাঁদের প্রয়োজন ছিল নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত চিকিৎসা আর আপনজনের সঙ্গ সেই সময়েই তাঁরা দিন কাটাচ্ছেন চরম অনিশ্চয়তায়। যে হাত একদিন রিকশার হ্যান্ডেল ধরে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়েছে, সেই হাত আজ ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থেকে প্লাস্টিক কুড়িয়ে নিজেদের বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় করছে।
কালাম মোল্লা ও জরিনা বেগমের এই জীবনসংগ্রাম শুধু একটি পরিবারের অসহায়ত্বের গল্প নয়; এটি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সমাজের মানবিকতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
অসহায় এই দম্পতির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাঁদের জন্য নিয়মিত সরকারি সহায়তা, চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং নিরাপদ ও মানবিক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
জীবনের শেষ বেলায় কালাম মোল্লা ও জরিনা বেগমের চাওয়া খুব বেশি নয় একটু নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকা, দুমুঠো খাবার, অসুস্থ হলে চিকিৎসা আর মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই। যে বাবা একদিন রিকশা চালিয়ে পাঁচ সন্তানকে মানুষ করেছেন, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন অবহেলা আর অভাবের অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।








