Logo

দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৪
দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে কক্সবাজার থেকে পর্যটক নিয়ে দ্বীপটির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে পর্যটকবাহী জাহাজ।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ বিরতির পর সমুদ্রপথে সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত ভ্রমণপিপাসুরা। একই সঙ্গে পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ায় আশার আলো দেখছেন দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ঘাটে পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকে। কারও হাতে ভ্রমণের ব্যাগ, কারও চোখে প্রবাল দ্বীপের নীল সমুদ্র দেখার স্বপ্ন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পর্যটকদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সকাল সাড়ে ৭টায় হুইসেল বাজিয়ে ঘাট ছাড়ে এমভি বার আউলিয়া। জাহাজটিতে ছিলেন ৮৩৬ জন পর্যটক।

দীর্ঘদিন পর সমুদ্রের ঢেউ পেরিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে জাহাজের যাত্রা শুরু হওয়ায় পর্যটকদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উচ্ছ্বাস।

বিজ্ঞাপন

প্রথম দিনে একটি জাহাজ, শুক্রবার যুক্ত হচ্ছে আরও দুটি

সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানিয়েছেন, চলতি পর্যটন মৌসুমে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জাহাজ পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম দিনে শুধু এমভি বার আউলিয়া পর্যটক নিয়ে যাত্রা করেছে। অনুমোদন পাওয়া অন্য দুটি জাহাজ শুক্রবার থেকে চলাচল শুরু করবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, এবার পর্যটক পরিবহনের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশাবাদী। ধীরে ধীরে দ্বীপকেন্দ্রিক পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে প্রত্যাশা তাঁদের।

হোসাইন ইসলাম বাহাদুর আরও জানান, মন্ত্রণালয়ের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটক পরিবহনের কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ দিন পর ৫ নভেম্বর থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। যাত্রার আগে জাহাজগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ও অন্যান্য সুরক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ নজরদারি

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিন একটি জাহাজ চলাচল শুরু করলেও পর্যায়ক্রমে অনুমোদন পাওয়া অন্য জাহাজগুলোও এই নৌপথে যুক্ত হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, পর্যটক পরিবহনের পাশাপাশি সেন্টমার্টিন দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পর্যটকদের যাতায়াত, দ্বীপে অবস্থান এবং চলাফেরার ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

অনুমোদন নিয়ে শেষ মুহূর্তেও ছিল অনিশ্চয়তা

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার সন্ধ্যায় কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে নোঙর করে রাখা হয় পর্যটক পরিবহনের জন্য প্রস্তুত তিনটি জাহাজ। যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে জাহাজগুলো সংস্কার, আসনব্যবস্থা ও সাজসজ্জার কাজ আগেই সম্পন্ন করা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিও শেষ করে রেখেছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অনুমোদিত তিনটি জাহাজ হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ। এগুলোর সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়া ৮৫০ জন, এমভি কর্ণফুলি ৭৩২ জন এবং এমভি টেকনাফ ৭১৬ জন যাত্রী বহন করতে সক্ষম।

বিজ্ঞাপন

বুধবার সকাল থেকেই বৃহস্পতিবার তিনটি জাহাজে পর্যটক পরিবহনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী টিকিট বিক্রিও শুরু করে জাহাজ কর্তৃপক্ষ। রাত ৮টা পর্যন্ত ৮০০টির বেশি টিকিট বিক্রি হয়। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টার দিকে জেলা প্রশাসকের সম্মতি না মেলায় পরদিন জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

পরবর্তী সময়ে আগে থেকে টিকিট কেটে রাখা পর্যটকদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি জাহাজ পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল ৭টায় নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে এমভি বার আউলিয়া সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা দেয়।

হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, জাহাজ পরিচালনার অনুমতি পেতে বুধবার পর্যন্ত মোট নয়টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই-বাছাইয়ের পর তিনটি জাহাজ অনুমোদন পেয়েছে। বাকি ছয়টি জাহাজের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জাহাজের ভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল জানান, সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের জন্য একমুখী জাহাজভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সর্বোচ্চ ভাড়ার টিকিটের সঙ্গে কেবিন ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, ট্যুরিজম বোর্ডের সার্ভারের মাধ্যমে জাহাজের টিকিট ইস্যু করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক এজেন্টের মাধ্যমে টিকিট বুকিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, আগে থেকেই টিকিট সংগ্রহ করা বিপুলসংখ্যক পর্যটকের বিষয়টি বিবেচনা করে বৃহস্পতিবার একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সকাল ৭টায় নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে জাহাজটি দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

পর্যটক পরিবহন নিয়ে সমন্বয় সভার উদ্যোগ

জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সমন্বয় সভা আয়োজনের কথা রয়েছে। সভায় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি পর্যটক পরিবহন ও সেন্টমার্টিন ভ্রমণসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

১৫ মার্চ পর্যন্ত চলবে পর্যটকবাহী জাহাজ

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫ নভেম্বর শুরু হওয়া জাহাজ চলাচল আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এই সময়ের শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত পর্যটকদের দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ থাকছে।

দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ ফিরে আসায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। দ্বীপের হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন ব্যবসায় আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে পর্যটন কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাল দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাও বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটকদের ভ্রমণের আনন্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রতিবেশ সংরক্ষণ করতে পারলেই এই পর্যটন মৌসুম দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD